৩ মার্চ, ২০৩৬। সোমবার।
বোস ব্রাদার্সের আধভাঙা বারান্দায় বসে আমি চায়ের কাপে ধোঁয়া ওঠা দেখছি। ধোঁয়াটা যেন সোজা ওপরে উঠছে না। সিলিংয়ের পুরোনো ভাঙা আস্তর ফুঁড়ে ফাটলধরা ছাদের ফাঁক গলে জং ধরা লোহার রড এড়িয়ে ধুলোর ভেতর দিয়ে এঁকে বেঁকে আকাশের দিকে চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, শহরের স্মৃতিও বুঝি এমনই, ভাঙা দেয়ালের গা বেয়ে উঠে কোথাও আশ্রয় খোঁজে।
কয়েকদিন বন্ধ থাকার পর রেস্তোরাঁটি আজ খুলেছে। দু ‘একটা টেবিলে কয়েকজন কাস্টমার বসে আছে।
নিচের রান্নাঘর থেকে কেমন একটা আঁশটে গন্ধ ভেসে আসছে। চায়ের কাপে চামচ নাড়ার শব্দও পাচ্ছি।
ক্যাশ কাউন্টারের ওপর বড় একটা গামলায় চিনির সিরার ভেতর হাবুডুবু খাচ্ছে গরম গরম রসগোল্লা, আর দুটো পাত্রে সিঙারা আর চমুচা।
কোণার দিকে ছড়িয়ে আছে ভাঙা ইট, চুন-সুরকি আর কংক্রিটের স্তূপ। যেন একটি জীবন্ত শরীরের অর্ধেক অস্ত্রোপচার হয়ে গেছে, বাকি অর্ধেক এখনো শ্বাস নিচ্ছে।
মাত্র তিন দিন আগে আদালতের অন্তর্বর্তী আদেশে ভাঙার কাজ স্থগিত রয়েছে। তরুণ এক আইনজীবীর আবেদনে এই সাময়িক স্বস্তি। উন্নয়নের যুক্তি আর ঐতিহ্যের দাবির লড়াই এখন বিচারাধীন। শহর অপেক্ষা করছে বিচারকের রায়ের জন্য, ইতিহাসের জন্য, নাকি নিজের বিবেকের জন্য, কেউ নিশ্চিত নয়। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ সড়কের বিস্তারের জন্য এটি ভেঙে ফেলতে চেয়েছিল। তার জন্য ঐতিহ্য আর ইতিহাসপ্রিয় মানুষগুলো পথে নেমেছে। ওরা মানববন্ধন করেছে, প্লেকার্ড লিখেছে। শেষ পর্যন্ত আদালত ভাঙার কাজে বাধ সাধল।
পুবের আলো এসে পড়েছে বোস ব্রাদার্সের ভাঙা বারান্দায়। জানালার ধারের টেবিলটি আজও খালি। দুইশ’ বছর ধরে এই টেবিলটি কত মানুষকে বসতে দেখেছে। আমিও কত বছর ধরে এখানে বসেছি। সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনগুলোর বেশির ভাগ তো এখানেই কেটেছে। আজও আমি আসলাম। বাইরের দিকে তাকালাম। দেখলাম একটা অদ্ভুত দর্শন মানুষ বোস ব্রাদার্সে ঢুকছে।
লোকটি ঢোকার মুহূর্তেই বুঝেছিলাম, সাধারণ কোনো কাস্টমার নয়। তাঁর চোখ দুটি ঘরে ঢুকেই চারপাশে এমনভাবে কী যেন খুঁজছিল। যেন প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি বস্তু, প্রতিটি কোণকে মেপে নিচ্ছে রহস্য উপন্যাসের কোনো গোয়েন্দা চরিত্রের মতো। মুখে অতি মৃদু হাসি কিন্তু গভীর ভাবনার ছাপ। যেন গোঁফে আঙুল বোলাতে বোলাতে এমন এক গোপন সত্যের কথা ভাবছেন, যা অন্য কেউ জানে না।
এখানকার বেশিরভাগ কাস্টমার বা গ্রাহক পরিচিত। তারা বোস ব্রাদার্সে ঢোকে খিদে অথবা আড্ডার তৃষ্ণা মেটাতে। এর দেয়ালের পলেস্তারা কোথায় খসে পড়ল, কোথায় হাড়ের মতো লোহা বেরিয়ে গেল, সেদিকে কারো নজর নেই।
কিন্তু এই লোকটি সেরকম নয়। তাকে আমি আগে কখনো দেখিনি। চারদিক ভালোভাবে দেখে শুনে কাউন্টার টেবিলে সাজানো সিঙারা আর সমুচার দিকে তাকিয়ে নাকটা একটু উঁচু করে একেবারে উল্টো দিকে ঘুরে এলেন। আমি অবাক হলাম। তিনি সোজা এসে আমার টেবিলে আমারই চেয়ারের উল্টোদিকে বসলেন।
একবার আমাকে ওপর-নিচে দেখে নিলেন। সম্ভবত যাচাই করলেন। সালাম দিলেন। করমর্দনের জন্য হাত বাড়ালেন। তারপর বললেন, এই হোটেলের রসমালাইয়ের নাকি দারুণ সুনাম।
আমি তাঁকে হেসে বললাম, ‘একসময় ছিল। সিঙারা, দই আর মিষ্টিরও খুব সুনাম ছিল। একসময় এখানে প্রতিদিন একটা করে রংপুরি খেতাম।’ তাকে একটা রসগোল্লা খাওয়ার পরামর্শ দিলাম। তিনি সন্তুষ্টির ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন।
একটা ওয়েটারকে ডেকে রসগোল্লার অর্ডার দিয়ে আমার দিকে গলা বাড়িয়ে নিচু স্বরে বললেন, ‘চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের কেউ আসছেন নাকি?’
আমি বললাম, ‘হয়তো আসবেন।’
তিনি আমার দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকালেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রত্ন অধিদপ্তরের কোনো লোক এসেছেন?
আমি এবার বুঝে গেছি । লোকটা নির্ঘাত গোয়েন্দা। বোস ব্রাদার্সে আজ একটা ঘটনা ঘটে গেছে।
তারপর আরও অধীর আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলেন, আজ কী এখানে কবিদের আড্ডা হবে?
এটাতো নতুন কিছু নয়। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বহু খ্যাতিমান লোক এখানে এসেছেন। সে সম্পর্কে আমি তো অনেক কিছুই জানি। জানলেও লোকটাকে আমি এসব কেন বলতে যাব? কেন তিনি এসব জানতে চান!
আমার অনাগ্রহ দেখে লোকটি একটু হতাশ হলেন। তিনি উপুড় হয়ে উঠে দুহাতে চেয়ারটা সামনে আমার আরও কাছে এনে জানতে চাইলেন, ‘আপনি কী প্রতিদিন এখানে আসেন?’
আমি একটু ইতস্তত করে বললাম, ‘না, প্রতিদিন এখানে আসি না।’
‘শেষবোর কবে এসেছিলেন?’
‘দশ বছর আগে। ২০২৬ সালের ৯ জুলাই মঙ্গলবার। সেদিন আষাঢ়ের প্রবল বৃষ্টিতে চট্টগ্রাম শহর ভেসে যাচ্ছিল। কক্সবাজারে পাহাড় ধসে তার আগের দিন ১০ জন মানুষ প্রাণ হারায়। চট্টগ্রাম শহরও পাহাড় ধসের আতঙ্কে।’
আপনি ঘোর বরষার দিনে কেন এসেছিলেন?
কোন যাদু মন্ত্রে জানি না, মানুষটির সমস্ত কৌতুহল মেটাতে লাগলাম। বললাম, বৃষ্টি হলে আমার মাথা ঠিক থাকে না। বোস ব্রাদার্স, ডিসি পাহাড়ের ভিজে যাওয়া শিরিষ গাছের জন্য আমার মনটা কেমন করে। তাই আমি এখানে চলে আসি। এই কাঁচে ঘেরা বোস ব্রাদার্সে, যখন এটা এত খণ্ডিত ছিল না, এত সংকুচিত ছিল না, তখন এর টেবিলে বসে কত কবিতা লিখেছি।
‘আপনি কবি!’ লোকটা যেন আকাশ থেকে পড়লেন। ‘আরে ভাই আমি তো আপনার কাছে জানতেই চাইলাম এখানে কোনো কবি আসবেন কিনা। আপনারা কবিরা, সাংস্কৃতিক কর্মীরাই তো আন্দোলন করে এই বোস ব্রাদার্সকে বাঁচালেন।
লোকটা কোনো কারণে আমাকে প্রশংসা করে তার কাছে টানতে চাইছেন। আমার তেমন ভালো লাগছে না। বললাম, ‘এই বোস ব্রাদার্সকে বাঁচিয়ে কোনো লাভ আছে? আমি যে বোস ব্রাদার্সকে ভালোবাসি, আমার স্মৃতির মধ্যে যে রেস্তোরাঁটি বেঁচে আছে সেটি এটি নয়। এখানে আর কোনো কবি আসে না, আড্ডা হয় না, কবিতা লেখা হয় না, কোনো নতুন সাহিত্য আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি হয় না এখানে। তা ছাড়া কোনো আন্দোলনে কাজ হবে না। উন্নয়নের দোহাই দিয়ে ওরা অনেক কিছু ভাঙবে। কই, আমি তো ফিরিঙ্গিবাজারের কবিরাজ ভবন নিয়ে কবিতা লিখেছি। কেউ কি ওটা রক্ষা করেছে?’
‘কিন্তু আপনি তবে কেন এলেন?’ লোকটি জানতে চাইলেন।
‘আমি এসেছি বিশেষ কারণে। বলতে পারেন আপনি যে কারণে এসেছেন, অনেকটা আমিও তাই।’
লোকটি চমকে গেলেন। ‘আপনি জানেন আমি কেন এসেছি? তাহলে আমাদের দুজনের উদ্দেশ্য যখন একই । আমাদের পরিচয় তো হতেই পারে? আমি আসলে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান ও ভবন, বিশেষ করে যেগুলোর একধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক মূল্য আছে সেগুলো নিয়ে গবেষণা করছি। আমার নাম সৌরভ মজুমদার।‘
সৌরভ আমার দিকে হাত বাড়িয়ে বললেন, ‘আপনার নামটা জানতে পারি?’
লোকটার প্রশ্নের উত্তর এড়ানোর জন্য আমি তাকে পাল্টা প্রশ্ন করলাম, ‘এই বোস ব্রাদার্সে আপনি এমন কিছু কি খুঁজে পেয়েছেন, যার প্রত্নমূল্য আছে?’
লোকটি যেন একটা গোপন কথা বলছেন, তেমনিভাবে আমার কানের কাছে মুখটা এনে ফিসফিস করে বললেন, ‘আমি সেরকম একটা গন্ধ পাচ্ছি। চারদিকে একটা ফিসফাস শব্দ শুনছি। এখানকার বয়বেয়ারাদের চোখে অদ্ভুত একটা রহস্য আর হাসি দেখতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে বাতাসে যেন কিছু একটা ভাসছে। আমি কি ভুল বলছি?’
তিনি ভুল বলেননি।
কয়েক ঘণ্টা আগে হোটেলের একজন বয় ভেঙে ফেলা ধ্বংসস্তূপে একটি পাথরের নিচে লুকিয়ে রাখা রহস্যময় একটি বাক্স খুঁজে পেয়েছে। সেটি অনেক পুরোনো এবং অপূর্ব কারুকাজে তৈরি।
আমি ঘটনাটা বলতেই মজুমদার বাবু গোঁফে আঙুল বুলিয়ে বললেন, ‘বাক্স নিয়েই এত উত্তেজনা? মনে হয় আপনি সব কথা খুলে বলছেন না।’
মজুমদার বাবু ঠিকই ধরেছিলেন।
কথার মোড় ঘোরাতে আমি তাঁর অসাধারণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার প্রশংসা করলাম। কিন্তু তিনি হাত নেড়ে সেটা উড়িয়ে দিলেন।
‘ভাইজন, অনুসন্ধিৎসা আমাকে প্রায় গোয়েন্দা বানিয়ে ফেলেছে। আর আমি চোখ দেখেই বুঝতে পারি কেউ কোনো কিছু লুকোচ্ছে কিনা। এবার বলুন তো, সেই বাক্সে আর কী ছিল?’
বুঝলাম, লোকটি শুধু তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষকই নন, দুর্দান্তভাবে প্রশ্নও করতে পারেন।
বাক্সটি বহু দশক আগে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, এ কথা স্পষ্ট ছিল। তাই আর রহস্য করার কোনো কারণ দেখলাম না। স্বীকার করলাম, বাক্সের ভেতরে চিঠিও ছিল।একটি প্রেমপত্র।
কথাটা শুনে তাঁর চোখ দুটো যেন চকচক করে উঠল।
‘এবার কিন্তু বিষয়টা সত্যিই আকর্ষণীয়! কার লেখা? কিংবা কাকে লেখা?’
যেই লিখে থাকুক, যার জন্যই লেখা হোক, চিঠিটি কখনো গন্তব্যে পৌঁছায়নি। কেউ পড়েও দেখেনি। তা না হলে আজ এত বছর পর সেটি আবিষ্কৃত হতো না।
মুজমদার বাবু বললেন, ‘অপঠিত একটি প্রেমপত্র… এর চেয়ে করুণ আর কিছু কি হতে পারে?’
আমি কি এতটাই সহজে ধরা পড়ে গিয়েছিলাম, নাকি তিনি সত্যিই মানুষের মনের কথা পড়তে পারতেন?
মাত্র কয়েক মিনিটের পরিচয়। অথচ মনে হচ্ছিল, তিনি মানুষকে বইয়ের পাতার মতো পড়তে পারেন।
আমি বললাম, ঠিকই বলেছেন। যতটুকু জানি, চিঠিতে কোনো একজন কবি, তার আরাধ্য প্রেমিকাকে ডিসি পাহাড়ের শিরিষ তলায়, একটি বইয়ের দোকানে অথবা জলিলগঞ্জে নদীর ধারে পুরোনো ভাঙা মন্দিরের পাশে আসার অনুরোধ করেছিল। তাতে প্রেমের নিবেদনও ছিল।’
‘তাহলে আপনার ধারণা, এটা একজন কবির প্রেমপত্র?’
‘হতে পারে। ডিসি পাহাড়, বইয়ের দোকান কিংবা নদীর ঘাট খুব বেশি দূরে নয়। ভাঙা মন্দিরটাকে নদী এতদিনে গিলে খেয়েছে। বইয়ের দোকানটাও নেই। দু’একটা শিরিষ গাছ এখনো ডিসি পাহাড়ে আছে। চাইলে একদিন ঘুরে দেখতে পারেন।’
‘কিন্তু চিঠিটা তো কখনো প্রাপকের কাছে পৌঁছায়নি। আর যিনি লিখেছিলেন, তিনি নিশ্চয়ই কষ্টকর প্রতীক্ষায় ছিলেন।’
লোকটা ক্রমশ আমাকে তার কথার ফাঁদে ফেলে সব কিছু আদায় করে নিচ্ছে। নিজের অজান্তে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে গেল আমার বুকের ভেতর থেকে।
মজুমদার সাহেব বললেন, ‘আমাকে একজন বলেছে,
চিঠির ভাষা এতটাই অপূর্ব ছিল যে পড়ে তার চোখে জল এসে গিয়েছিল। এমন লেখা হয় কোনো অসাধারণ কবির হাতে, না হয় গভীর প্রেমে পড়া কোনো মানুষের কলমে।
আপনি তো কবি, আপনার কী ধারণা এই বোস ব্রাদার্সে এক সময় কবিরা এখানে আসতেন, তাদেরই কেউ লিখেছেন?’
প্রশ্নটা তিনি আমাকে এমন ভাবে করলেন, যেন আমাকেই সন্দেহ করছেন,আমি বললাম, ‘তা আমি কী করে জানি? আমি কিছুই জানি না। কিছুই জানি না।’
মজুমদার এবার আমার দিকে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বললেন, আপনি ২০২৬ সালের আগে কখন এসেছিলেন?’
‘২০১৭ সালে।’
লোকটি একের পর এক আমাকে প্রশ্ন করেই চলেছে। আর আমিও তাকে সব প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছি। যেন এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিতে না পারলে আমার বৈতরণী পার হবে না।
‘আপনারা এখানে নিয়মিত আড্ডা দিতেন, সেটা কখন কোন সালে?’
আমি এবার আশি দশকের আমাদের যৌবনের দিনগুলোর কথা বললাম। রাজপথের মিছিলের কথা জানালাম। বোস ব্রাদার্সে বিরতিহীন কবিতার দিনগুলোর কথা জানালাম।
তিনি বললেন, ‘সেই আশির দশকের কোনো একটা সময় হয়তো এই চিঠিটি লেখা হয়েছিল।’
আমি চমকে গেলাম। বললাম, ‘আমি জানি না। মাঝখানে আমি যুক্তরাষ্ট্রে চলে গিয়েছিলাম। আবার অবশ্য ফিরেও আসি।’
মজুমদার আমার চোখের দিকে তাকিয়ে কী যেন খুঁজতে লাগলেন। তারপর যেন কোনো রহস্য উদ্ধার করে বললেন, ‘মনে হয় আমরা রহস্যের খুব কাছাকাছি এসে গেছি,’ তিনি বললেন। ‘দয়া করে আমাকে আর কিছু প্রশ্নের উত্তর দিন। এরপর আপনি এখানে আর আসেননি কেন?’
এবার সত্য কথাটা তাকে বলতেই হয়। বললাম, ‘আমি তো দুই বছর কোমায় ছিলাম। তারপর ২০২১ সালে আমি চিরতরে চোখটা বন্ধ করি। মৃত্যুর পর আমি দ্বিতীয়বার আজ এখানে এলাম। আমি জানি এখানে চিঠিটি আজ পাওয়া যাবে।’
আমি আর এ পৃথিবীতে নেই জেনে লোকটা স্তব্ধ হয়ে গেল। আমরা দুজনেই চুপ হয়ে রইলাম।
তারপর মজুমদার সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘ইতিহাস কখনো কখনো সবচেয়ে ক্ষুদ্র কাকতালীয় ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু চিঠিটি কে লিখেছিলেন, সে সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই? শেষে কি নামও ছিল না?’
আমি মাথা নেড়ে বললাম, ‘ ছিল, তবে পুরো নাম নয়। শুধু একটি অক্ষর—এস। এর বেশি আমি কিছু জানি না।’
‘চিঠিটা এখন কোথায়?’
‘হোটেলের ম্যানেজারের কাছে।’
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই মজুমদার উঠে দাঁড়ালেন। দ্রুত পায়ে রিসেপশনের দিকে চলে গেলেন।
ম্যানেজার শেষ পর্যন্ত তাঁকে চিঠিটি হয়তো দেখিয়েছিলেন। তবে পরের কয়েক দিন পুরো হোটেলে একটাই আলোচনা, তাকে নাকি হোটেলের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে।
একজন বয় জানালেন, টিঅ্যান্ডটির টাওয়ারের দিকে মুখ করে দীর্ঘক্ষণ গভীর চিন্তায় মগ্ন ছিলেন।
বোস ব্রাদার্সে শতবর্ষ ধরে কারা কারা আসতেন তার খবর নিতে শুরু করেছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন। মনে হয়, রহস্যময় ‘এস’ অক্ষরের সঙ্গে কোনো কবির নাম মেলানোর চেষ্টা করছিলেন।
এই হোটেলে তো কত কিংবদন্তি মানুষের পদচিহ্ন। কথাসাহিত্যিক, কবি, ছড়াকার, বংশীবাদক, রাজনীতিবিদ সাংস্কৃতিক কর্মী, সংগঠক। তালিকাটা সত্যিই দীর্ঘ।
বোস ব্রাদার্সের চারপাশ, এর খণ্ডিত স্থাপত্য, দেয়াল, সবকিছু তিনি মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন। এমনকি তাঁকে দেখা গেছে ডিসি পাহাড়ের শতবর্ষী বৃক্ষের শীতল ছায়ায় ধীরে ধীরে হাঁটতে। তিনি দেখেছেন, জলিলগঞ্জে পায়ের কাছে নদী মৃদুস্বরে বয়ে চলেছে। তিনি যেন সে পথই অনুসরণ করছিলেন, যে পথে হয়তো একদিন কবি তার প্রেমিকাকে নিয়ে হেঁটে যাওয়ার কথা ভেবেছিলেন।
আরো একদিন আমি লোকটাকে দেখলাম বোস ব্রাদার্সে। আমাকে দেখেই বললেন, ‘আপনি এসেছেন?’
বললাম, এটাই আমার শেষ আসা। তিনি ধীরে ধীরে বললেন, চিঠিটি কে লিখেছিল বা কী ঘটেছিল, সেটাই মুখ্য নয়। আসল বিষয় হলো চিঠিটা।
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘চিঠিটা?’
‘হ্যাঁ। প্রথমে আমার মনে হয়েছিল, চিঠিটি লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে বুঝলাম, আমি ভুল ভেবেছিলাম। চিঠিটি কখনোই সত্যিকার অর্থে লুকানো ছিল না। বরং শুরু থেকেই সবার চোখের সামনেই ছিল। আমরা শুধু তাকাতে ভুলে যাই।
আমার মুখের বিভ্রান্তি দেখে তিনি সামান্য ঝুঁকে এসে নিচু স্বরে বললেন, ‘একবার ভেবে দেখুন। সে চিঠির কবিতার মতো ভাষা, তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা অতীতের গোপন ইঙ্গিত, দৈনন্দিন পৃথিবীকে পেছনে ফেলে এক রোমাঞ্চকর প্রেমযাত্রায় বেরিয়ে পড়ার আহ্বান, অনুভূতির সৌন্দর্য, ইতিহাসের গভীরতা—এসব কি আপনাকে আর কোনো কিছুর কথা মনে করিয়ে দেয় না?’
আমি তো জানি এসব। মৃদু হেসে চুপ করে রইলাম।
তিনিও মৃদু হেসে চারপাশের দিকে তাকালেন। ‘এই জায়গাটা… এর আত্মা, এর সৌন্দর্য, এর ইতিহাস। মনে হতে পারে, এগুলো তো চোখ এড়ানোর কথা নয়। অথচ আমিও সেগুলো সত্যিকার অর্থে দেখতে পাইনি। সে রহস্যময় চিঠিটিই আমাকে চোখ মেলে দেখতে শিখিয়েছে। আমি এই দেয়ালের ভেতরে কোনো গুপ্ত রহস্য খুঁজছিলাম। শেষে আবিষ্কার করলাম, রহস্যটি তো শুরু থেকেই আমার চোখের সামনেই ছিল।’
তিনি চারদিকে তাকিয়ে যেন প্রতিটি দেয়াল, প্রতিটি খোদাই, প্রতিটি জানালাকে নতুন করে দেখলেন।
‘আসল সত্য কখনো নকল করা যায় না। এই হোটেলের প্রতিটি দেয়ালে, প্রতিটি খোদাই করা কাঠের টুকরোয়, আলো-ছায়ার প্রতিটি খেলায় সে সত্য বেঁচে আছে। শত বছরের ইতিহাস, প্রেম, শিল্প আর মানুষের স্বপ্ন এই জায়গার প্রতিটি কোণে মিশে আছে।’
তিনি একটু থামলেন। ‘ওই লুকানো চিঠিটাই ছিল এই জায়গার দরজা খোলার চাবি। যেন সে আমাকে বলছিল—চলো, প্রতিদিনের একঘেয়ে পৃথিবী ছেড়ে বিস্ময়ের এক অন্য জগতে প্রবেশ করি। এখানে এসে প্রত্যেক মানুষই হয়তো সে চাবিটাই খুঁজতে আসে। আর প্রত্যেকে সেটি নিজের মতো করে খুঁজে পায়।’
কথাগুলো বলে তিনি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। আমার দিকে তাকিয়ে বিদায় জানালেন। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। কী বিদায় জানাব! আমি তো অনেক আগেই এই পৃথিবীকে বিদায় জানিয়েছি।
