পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা জনগোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে। তবে কেবল চাকমারাই নয়, সে সঙ্গে আরও কয়েকটি আদিবাসী জাতি সেখানে সহাবস্থানের নীতি মেনে পাশাপাশি জীবন অতিবাহিত করে আসছেন সে আদিকাল থেকে মোগল আমল পর্যন্ত। সে সময়ে পার্বত্য অঞ্চলের মূল আদিবাসী জনগোষ্ঠী ছিল দশটি। চাকমা মারমা ত্রিপুরা চাক মুরুং বা ম্রো খুমি লুসাই খিয়াং বম ও পাংখোয়া। এই জাতিগুলো সম্পর্কে বিশিষ্ট ইতিহাসকার বিকচকুমার চৌধুরী লিখেছেন :
ÔThough these people possess diverse national identity, they have cultural, religious and ethinic affinity among themselves quite different from the Bengali-Muslims, the rulling and dominant class in Bangladesh. The indigenous people of the CHT (Chittagong Hill Tracts) have been living side by side for centuries together without any racial conflict. …’
(Genesis of Chakma Movement (1772-1989) : Historic Background, pp. 2-3).
পার্বত্য অঞ্চলের এ জাতিগুলো স্বভাবতই শান্তিপ্রিয়, নিজেদের কাজকর্মে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত, বন্ধুত্বপূর্ণ, প্রতিবেশীসুলভ মনোভাবের অধিকারী এবং বড়ত্ব বা অধিপতি মনোভাব প্রদর্শনের বিপক্ষে গভীর অভিমানী। কিন্তু তা সত্ত্বেও প্রধানত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমল থেকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে এখানে যা নিষ্করুণভাবে ঘটে চলেছে তা হলো অবাঞ্ছিত অনুপ্রবেশের মাধ্যমে তাদের অবস্থানকে নড়বড়ে ও অস্থির করে তোলার চেষ্টা। উল্লিখিত জাতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে সংগঠিত ও সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সে অর্থে শক্তিশালী জাতিসত্তাটি হলো চাকমা। আরাকানিদের ভাষায় এরা হলো ‘সক’ বা ‘সাক’ (Saks) বা (Theks)। স্থানীয় ভাষায় তাদের ডাকা হতো ‘ছেক’ বলে। ১৫৪৬ সালে আরাকানের রাজা মেং বেং (Meng Beng)-এর সঙ্গে বর্মীদের যুদ্ধ সংঘটিত হলে তাতে ‘সাক’ রাজা বর্মীদের পক্ষে অংশ নিয়ে আরাকানিদের পরাজিত করেন এবং কক্সবাজারের রামু অঞ্চলটি দখল করে নেন।
ইংরেজ ও অন্য ইয়োরোপীয়রা যখন ভারতবর্ষে বণিকবৃত্তি নিয়ে অনুপ্রবেশ করে তখনও চাকমারা ছিল এ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতিসত্তাবিশেষ। ১৬১৫ সালের দিকে পর্তুগিজরা তাদের দঈযধশড়সধং’ বলে উল্লেখ করেছে নিজেদের বিভিন্ন লেখাপত্রে। ওই সময়ে জোয়া ডি ব্যারোস নামের এক পর্তুগিজ নাবিক ‘কোয়ার্টা ডিকাডা ডা এশিয়া’ (Quarta decada da asia) নামে একটি বই লেখেন, যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘এশিয়ায় চার দশক। এই বইয়ে ‘চাকোমাস’ বলে একটি স্থানেরও বিবরণ দিয়েছেন তিনি এবং সে স্থানটির অবস্থান নির্দেশ করা হয়েছে কর্ণফুলি নদীর পূর্বতীর। এটি ছিল চাকমা জনগোষ্ঠীর প্রাচীন আবাসস্থল। ১৫৯৩ থেকে ১৬১২ সালের মধ্যে এ অঞ্চল আরাকানরাজ রাজগ্রি সেলিম শাহ নানা যুদ্ধবিগ্রহের মাধ্যমে দখল করে নেন এবং এখানে তার রাজত্ব কায়েম করেন। আরাকানিদের হাতে পরাজিত হয়ে চাকমারা, যে-তিন পার্বত্য জেলাকে (রাঙামাটি বান্দরবান খাগড়াছড়ি) এখন একত্রে পার্বত্য চট্টগ্রাম বা ‘সিএইচটি’ বলা হয়, তার বিভিন্ন স্থানের পর্বত ও অরণ্যময় অঞ্চলে ঠাঁই নেয় নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মোকাবিলা করে। এভাবে চাকমারা পার্বত্য অঞ্চলের ‘আলেকইয়াংদন’ (Quarta decada da asia) নামক স্থানে তাদের রাজ্যের রাজধানী স্থাপন করে। গবেষকেরা বলছেন, বর্তমান বান্দরবান জেলার আলিকদমই ছিল সেই প্রাচীন ‘আলেকইয়াংদন’। তাদের জীবনের এসব নিরন্তর ঘাত-প্রতিঘাত, ক্বচিৎ স্থিতিশীলতা ও কালে কালে উপস্থিত হওয়া সংকট-সমস্যা নিয়ে চাকমা সমাজে ‘চাদিগাং ছাড়া পালা’ নামে একটি অতি মর্মন্তুদ আবেদনসমৃদ্ধ লোককাহিনি প্রচলিত আছে। উল্লিখিত আলিকদম থেকে চাকমারা বিচ্ছিন্নভাবে পার্বত্য অঞ্চলের নানাস্থানে এবং পার্শ্ববর্তী জেলা চট্টগ্রাম সংলগ্ন এলাকা, যেমন রাঙ্গুনিয়া রাউজান ও ফটিকছড়ি অঞ্চল ঘিরে নিজেদের সাধ্যমতো বসতি গড়ে তোলে।
১৬৬৬ সালে বাংলার মোগল সুবেদার শায়েস্তা খান আরাকানিদের পরাজিত করে সমগ্র চট্টগ্রাম অঞ্চল দখল করে মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেন। এবং এটির নতুন নাম দেন ‘ইসলামাবাদ’। লক্ষণীয় দিক হলো, তিনি এ সময়ে চাকমা অধ্যুষিত জনপদের দিকে কোনো অভিযান বা আক্রমণ পরিচালনা করা থেকে বিরত থাকেন। ফলে মোগল বিজয়ের প্রাথমিকপর্বে চাকমা ও মোগলদের মধ্যে ভেদ-বিভেদ বা সম্পর্কের অবনতিমূলক অপ্রীতিকর কোনো খবর পাওয়া যায় না। চাকমা জাতির ওপর প্রকৃত বিপর্যয়কর পরিস্থিতি আরোপিত হতে দেখা যায় ভারতে ইংরেজ ঔপনিবেশিক শক্তির শাসন কায়েমের পর।
১৭৬১ সালের ৫ জানুয়ারি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধি হিশেবে হ্যারি ভেরেলেস্ট (Harry Verelst) সেকালের বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলার দায়িত্ব নেন, যার আওতাধীন ছিল এখনকার তিন পার্বত্য জেলা তথা সমগ্র পার্বত্য অঞ্চলও। তার দায়িত্ব গ্রহণের ঠিক অব্যবহিত আগে এ অঞ্চলে মোগল রাজপ্রশাসনের পক্ষে দায়িত্বে ছিলেন মহম্মদ রেজা খাঁ। তার কাছ থেকে দায়িত্ব নিয়ে প্রায় অনতিবিলম্বে হ্যারি ভেরেলেস্ট চাকমাদের ওপর প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। তখন চাকমা রাজা ছিলেন শের দৌলত খাঁ, যার প্রধান সেনাপতি ছিলেন রানু বা রু নু খাঁ, যিনি তখনকার গেরিলা পদ্ধতির যুদ্ধবিশারদরূপে বিপুল খ্যাতি অর্জন করে কিংবদন্তির নায়করূপে চাকমা লোক-ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন। চাকমাপ্রধান শের দৌলত খাঁ আগে সমঝোতার ভিত্তিতে মোগলদের কর দিতেন এবং বিনিময়ে ছিলেন নিজ এলাকা শাসনে সম্পূর্ণ স্বাধীন। শের দৌলত খাঁ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধিপতিসুলভ কর্র্তৃত্ব মানতে গররাজি ছিলেন তাদের উত্তরোত্তর দৌরাত্ম্যমূলক আচরণের কারণে। ফলে তার সময়ে এ অঞ্চল ধীরে ধীরে অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। হ্যারি ভেরেলেস্ট চাকমা রাজার ওপর মোগলদের চেয়ে বহুল পরিমাণে রাজস্ব বাড়িয়ে দিলেন কোনো কূটনৈতিক সদাচরণ অনুসরণ ব্যতিরেকে। তার এসব একতরফা পদক্ষেপ সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্যে বড় উপকরণরূপে কাজ করে। পরিশেষে হলোও তাই। কোম্পানির সঙ্গে চাকমারাজের যুদ্ধ বাধে অচিরে এবং সে যুদ্ধ চলে ১৭৭৬ থেকে ১৭৮৭ সাল পর্যন্ত।
ঐতিহাসিক সুপ্রকাশ রায় এ প্রসঙ্গে বলছেন, ‘১৭৭৬ খ্রীষ্টাব্দের মধ্যভাগে চাক্মাগণ প্রথমবার বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহের নায়ক ছিলেন চাকমা-দলপতি শের দৌলত ও তাঁহার সেনাপতি রামু খাঁ। রামু খাঁ সাধারণের নিকট ‘সেনাপতি’ বলিয়া পরিচিত ছিলেন। চাক্মাদের উপর সেনাপতি রামু খাঁর অসাধারণ প্রভাব-প্রতিপত্তি ছিল। ইংরেজ শাসকদের দ্বারা নিযুক্ত ইজারাদারগণের শোষণ-উৎপীড়ন সহ্যের সীমা অতিক্রম করিলে রামু ও শের দৌলত খাঁ চাক্মা জাতির সকল লোককে একত্র করিয়া ইজারাদারি ও ইংরেজ শাসনের মূলোচ্ছেদ করিবার জন্য প্রস্তুত হন। প্রথমে কার্পাস-কর দেওয়া বন্ধ হয় এবং তাহার সঙ্গে সঙ্গে ইজারাদারগণের তুলার গোলা লুণ্ঠিত হয়। রামু খাঁর নেতৃত্বে চাক্মাগণ ইজারাদারদের বড় বড় ঘাঁটি ধ্বংস করিয়া ফেলে।’
১৭৮২ সালে শের দৌলত খাঁর মৃত্যুর পর তার পুত্র জানবক্স খাঁ চাকমাপ্রধান মনোনীত হন। তিনিও চাকমা অঞ্চলে ইজারাদারের প্রবেশ বন্ধ করে দেন। ১৭৮২ সালের দ্বিতীয় চাকমা বিদ্রোহ-বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন ব্রিটিশ ডেপুটি কমিশনার টিএইচ লুইন লিখেছেন : ‘ইজাদারগণ এই উপজাতির উপর ভীষণ অত্যাচার করিত। তাহার ফলে বহু চাক্মা নিকটবর্তী আরাকান অঞ্চলেও পলায়ন করিয়াছিল। তাই চাক্মাগণ জানবক্স খাঁর নেতৃত্বে বিদ্রোহ করে। ১৭৮৪ সালে জানবক্স খাঁর নেতৃত্বে তৃতীয় এবং দ্বিতীয় শের দৌলত খাঁর নেতৃত্বে ১৭৮৭ সালে চতুর্থ চাকমা বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। ১৭৮৯ সালে পরপর চারটি চাকমা বিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে।
দুই
চাকমা সমাজের মানুষেরা যে-ভাষায় তাদের ঘরোয়া, সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক জীবনের ভাব-অভিব্যক্তি প্রকাশ করে থাকে তা হলো তিব্বতি-বর্মী (Tibeto-Burman) পরিবারের ভাষা। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায়ও চাকমারা স্বচ্ছন্দে কথা বলে। আবার চট্টগ্রামি ভাষাটা হলো প্রাচ্য ভারতীয় আর্যভাষার (Eastern Indo-Aryan Language) অন্তর্ভুক্ত, যেটি বাংলা ভাষার খুব কাছাকাছি একটি ভাষিকভঙ্গি। একালের চাকমা সমাজের লোকেরা যে-ভাষায় কথা বলে তার নাম ‘চাংমা ভাজ’ বা ‘চাংমা কধা’। এটি হলো উল্লিখিত প্রাচ্য ভারতীয় আর্যভাষার অন্তর্ভুক্ত দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় বাংলা ভাষার একটি শাখা। ‘চাংমা ভাজ’-এর বর্ণমালা যে-হরফে লেখা হয় তাকে বলা হয় ‘ওঝোপাত’ (Ojhopath)। চাকমারা সাধারণত যে-লিপি ব্যবহার করে তার নাম ‘খমের’ (Khmer) লিপি। এ লিপি কম্বোডিয়া (কম্পুচিয়া), লাওস, শ্যাম (থাইল্যান্ড) ও দক্ষিণ ব্রহ্ম (মিয়ানমার)-এ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও চাকমাসহ পাহাড়ে বসবাসকারী বেশির ভাগ পার্বত্য আদি বাসিন্দাদের কোনো সাহিত্যিক বা ঐতিহাসিক তথ্য তেমন করে কোথাও লিপিবদ্ধ নেই। ফলে তাদের মৌখিক ঐতিহ্যের (Oral Tradition) ওপর ভর করে তাদের জাতিগত পরিচয়, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক স্বতন্ত্রতা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি চিহ্নিত করে তাদের উৎস খুঁজে পাবার চেষ্টা করেন ঐতিহাসিকেরা।
এই মৌখিক ঐতিহ্যের ওপরই চাকমা সমাজে গড়ে ওঠেছে বিপুল লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতির ভান্ডার। তার মধ্যে আছে— ‘গেঙ্গুলি’ বা চারণকবিদের গান, বারোমাস্যা, ছড়া, হেঁয়ালি, চাটিগাঁ ছাড়া পালা, সৃষ্টিপত্তন পালা, স্বর্গপালা, রাধামন-ধনপুদি পালা, রঙ্গ-কৌতুক, সৃষ্টিকর্তার প্রশস্তিমূলক গান বা লামা, পাহাড় পাড়ি দেবার সময় গাওয়া উভাগীত, ডাক কধা বা প্রবাদ-প্রবচন, ধাঁধা, নীতিগর্ভ কথকতা ইত্যাদি। এই সমৃদ্ধ লোকায়ত সাহিত্য ও সংস্কৃতির সম্ভার চাকমা সমাজের মূল্যবান অলংকার ও অহংকার হিসেবে বিবেচিত। নিজেদের লোক-মনস্তত্ত্বের গভীরে ডুব দিয়ে লোকসমাজের উচ্চার্য লব্জের মাধ্যমে সেকালের গেঙ্গুলি বা চারণকবির দল ও অন্যান্য ক্ষেত্রের চাকমা ভাবুকেরা যে অসাধারণ চিন্ময় জগতের ছবি এঁকে গেছেন জনপদের হাটে-ঘাটে-বাটে মূলত তার একটির অন্তর্দেশে প্রবেশের চেষ্টারূপে এ অকিঞ্চিৎকর গদ্যের অবতারণা।
এই অবতারণায় চাকমা লোকছড়ার ভাণ্ডার থেকে উৎকলিত একটি ছড়া আমাদের মনোভাব প্রকাশের অনুকূলে পাঠ করা যাক প্রথমে, যা বাংলা হরফে চাকমা উচ্চারণ মান্য করে লিখিত :
জুনিপুগে মান্নিক নিন্দে সোনা নিন্দে পিদলে। অমানুজ্যে মানুজ নিন্দে ঘি নিন্দে চিদলে।
সেকালের ধর্মবর্ণগোত্র নির্বিশেষে লোকায়ত সমাজের পরতে পরতে নানা দৈব, আধিভৌতিক ও অলৌকিকশক্তির প্রতি পক্ষপাতিত্বের এক বড় পরিমণ্ডল ছিল, যা লোকসাহিত্যের ইতিহাসে যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সেসব লোকায়ত জীবনের উপাদানে অনেক বাস্তব ও সম্মুখস্থ ঘটনা ও দৃশ্যের বয়ানও রয়েছে যা আপাত বিচারে অবিশ্বাস্য বা দুর্বল মনের প্রকাশ বলে মনে হলেও প্রকৃতই যা ঘটেছিল সে ধূসর কালের পটভূমে। লোকমানুষ সত্যি সত্যি সেসব লৌকিক-অলৌকিক ঘটনাবলির মুখোমুখি হয়েছিল। দুর্ভাগ্যের বিষয় যে, সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষদর্শনজাত আর তাদের অনাবিল মনোজগতে উদ্ভূত সে অনুষঙ্গগুলোর বিস্ময়কর, আবেগঘন, চমক জাগানিয়া, অনুধাবনা-উদ্রেককারী ও স্বকপোলকল্পিত বয়ানকে ঔপনিবেশিকের নির্মিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত কেজোবুদ্ধির মানুষেরা চিরকালই হেলা করে গেছে নাকউঁচা মনোভাবে। আবার এর বিপরীত চিত্রও দেখা যায়, যার পরিমাণও মোটেও কম নয়। এসব লোকায়ত দর্শন ও বিশ্বাসের জগতের অতি অপূর্ব চমৎকারিত্ব ও অভিনবত্বে বহু খ্যাতিমান সৃজনশীল মানুষের মন মজেছে। বিশ্ববিশ্রুত ইংরেজ নাট্যকার ও কবি উইলিয়াম শেক্সপিয়রের নাটকে ডাইনি ও ভূতের উপস্থিতি লোকসমাজের সে ভেতরের তন্ত্রমন্ত্র মানা ও ভৌতিক আচার-আচরণের জগত থেকেই ওঠে এসেছে। যেমন, উইলিয়াম শেক্সপিয়রের বিখ্যাত ‘ম্যাকবেথ’ নাটকের আখ্যান অংশে দেখা যায়, স্কটল্যান্ডের দুঃসাহসী সেনাপতি ম্যাকবেথ তিন ডাইনির ভবিষ্যদ্বাণী থেকে জানতে পারেন যে, একদিন তিনি স্কটল্যান্ডের রাজা হবেন। এ উচ্চাকাঙ্ক্ষার বশবর্তী হয়ে তিনি রাজা ডানকানকে হত্যা করে বসেন এবং স্কটল্যান্ডের সিংহাসনেও আরোহণ করেন। নাট্যাংশের শেষদিকে যদিও তার পরিণতি ভালো হয়নি। তবে সে অন্য প্রসঙ্গ।
তিন
আমাদের দেশেও এ রকম দেদার লোকায়ত ধ্যানধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, বনজঙ্গল ও ঝোপঝাড়ের জোনাকিরা (জুনিপুগ) উজ্জ্বল আলোবিশিষ্ট কোনো কোনো বনচর বা স্থলভাগের ভুজঙ্গ বা সাপের মাথায় থাকা রত্নের দ্যুতিকে সহ্য করতে পারে না। তারা ওই রত্নের দ্যুতিকে নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার পক্ষে সমূহ হুমকি বিবেচনা করে নিত্য অবজ্ঞা ও অবহেলা করে থাকে। যেহেতু ওটা তাদের থেকেও বেশি এবং উজ্জ্বল আলোবিতরণকারী। সাপেরা এই আলোময় বিচরণের সুবাদে সর্বমহলে অকাতরে প্রশংসা পায় বলে জোনাকিরা বেজায় বেজার থাকে সর্বক্ষণ। একই লোকবিশ্বাসে আরও বলা হচ্ছে, এই মায়াবী আলোবিকিরণকারী রত্নটিকে সাপ তার প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে এবং কোনো দৈব দুর্যোগে বা আচানক ঘটনার পরম্পরায় ওটা যদি তার কোল বা কাছছাড়া হয়ে যায়, সে তৎক্ষণাৎ মৃত্যুবরণ করে। সাপ তাই ওটাকে সবিশেষ মনোযোগের সঙ্গে আগলে রাখতে কখনো কসুর করে না।
ঠিক মানুষও তেমনি তার প্রীতি ও প্রিয়ভাজন ব্যক্তি, নিজস্ব ও পারিবারিক মূল্যবান সম্পদ-সহায়ের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায় প্রাণপণে। বস্তুত লোকবিশ্বাসে এই অবস্থার গভীর বাস্তবতাকেই ‘সাপের মণি’ বলে অভিহিত করা হয়েছে যা মণি-মানিক্য বা চুনি বা লালরঙের স্বচ্ছ দামি পাথর বা লোহিতক নামে সর্বসাধারণ্যে পরিচিত। এখানে আক্ষরিক অর্থে যা ‘মান্নিক’ (মানিক) মানে ‘সাপের ফণা’ থেকে বিচ্ছুরিত সে আলোকগুচ্ছকে বোঝানো হয়েছে।
আমাদের দেশের সেকালের এবং একালেরও অনেক সমতলী ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আটপৌরে জীবনযাপনের একটা বড় অংশ বনজঙ্গলের নিকটবর্তী বা অরণ্যবাসী হওয়ার কারণে তাদের মধ্যে উক্ত ধরনের উজ্জ্বল ফণাবিশিষ্ট সাপ বা স্থলচর সরীসৃপের মুখোমুখি হবার অভিজ্ঞতা থাকাটা একবোরেই অলীক বা অসম্ভব কিছু নয়। প্রসঙ্গক্রমে আমাদের মনে রাখতে হচ্ছে, সে আদি-অকৃত্রিম গহন-গভীর বন ও পাহাড়ের জীবনের তথ্য-উপাত্ত এই বস্তুবাদী সভ্যতার হাতে আর তেমন নেই। ফলে সুদূরকালের বনের মানুষ, পাহাড়ের মানুষ কত বিচিত্র প্রাণ ও জীববৈচিত্র্যের ভেতরে তাদের জীবনধারাকে পরস্পরনির্ভরতা বা সংলগ্নতার আবেষ্টনে গড়ে তুলেছিলেন, তা আমাদের খুব বেশি জানা নেই বললেই চলে। ‘আধুনিক’ মানুষের নির্মিত দুর্বিষহ, দুঃসহ বিরূপ পরিবেশ-প্রতিবেশ কত বৈচিত্র্যমণ্ডিত বন-পাহাড়ের অমূল্য পরিবেশবান্ধব জীব ও প্রাণের সংহার ঘটিয়ে গেছে নীরবে, তার কি কোনো ইয়ত্তা আছে? আজকাল এ কথা তো অহরহই গণমাধ্যমগুলোতে আসছে যে, অরণ্যচারী বা বনজীবীদের সঙ্গে তার পুরাকালীন বাস্তুসংস্থান ও খাদ্যসংস্কৃতি রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে মানবজীবনের ধারাবাহিক অভিজ্ঞতার সঞ্চয়কে সংরক্ষণের স্বার্থে। একই সঙ্গে এও কি সত্য নয় যে, ‘আধুনিক’ জীবনগড়ার জন্যে প্রায় বেপরোয়া নগরায়নের ছোবলে আমাদের বাল্যকালের নানা-নানি. দাদা-দাদি বা বয়োজ্যেষ্ঠদের মুখে শোনা জীবনঘনিষ্ঠ লোকায়ত মানুষের মৃত্তিকাবর্তী জ্ঞানমার্গ থেকে উচ্ছ্রিত এখানে উদ্ধৃত চারচরণবিশিষ্ট ছড়ার প্রথম পঙক্তি— ‘জুনিপুগে মান্নিক নিন্দে’— এমন বুদ্ধিখচিত উক্তির জন্ম!
বনচর বা পাহাড়ের অভ্যন্তরে বসবাসরত মানুষ বহুবিধ প্রয়োজনের ডাকে অন্ধকার রাতে জোনাকির মিটমিট আলোর আবহে আদিকাল থেকেই চলাফেরায় অভ্যস্ত। সে সঙ্গে অন্ধকারে বিচরণশীল বিচিত্র রকমের প্রাণী ও জীবজন্তুর প্রত্যক্ষদর্শনজাত অভিজ্ঞতা থেকে অসংখ্য ভীতিসঞ্চারক ভূতের গল্প, গান, ঘুমপাড়ানি ছড়া ও কেচ্ছাকাহিনির উদ্ভব হয়েছে, সে শুধু শুধু বাংলাদেশ ভূখণ্ডে তো নয়, বিশ্বলোকসাহিত্যের ভান্ডারেও তার ভূরিভূরি নজির রয়েছে। সে অভিজ্ঞতার পাশে হয়তো চাক্ষুষভাবে প্রত্যক্ষ জোনাকির মিটমিট আলো ও সাপের মানিকের ঔজ্জ্বল্যের সুস্পষ্ট তফাত তাদের মনে ওই অনিন্দ্যভাবের উদয় ঘটিয়েছে যে, ‘জুনিপুগে মান্নিক নিন্দে …
আবার এমনও তো হতে পারে, লোকসমাজে সতত বিরাজমান অতীব নিচুমনা ও কুঁদুলে-স্বভাবের একশ্রেণির মানুষের সঙ্গে উদারচেতা, উন্নতমনা ও স্বচ্ছ মননের অধিকারী মানুষগুলোর তুলনা করতে গিয়ে সংবেদনশীল লোককবিরা অমন প্রদীপ্ত, অমৃতসম বাক্যসৃজন করেছেন, একেবারেই আনমনে রূপকের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রেখে। এভাবে তাদের যৌক্তিক অথচ অবদমিত চিন্তা, ক্ষোভ ও দুঃখের মোক্ষণ ঘটিয়েছেন লোকসমাজের উচ্চার্য ভাষা বা লব্জের সহায়তায়। তথাকথিত অর্থে তারা নিরক্ষর ছিলেন বটে কিন্তু বোধবুদ্ধি বা একেবারে আক্কেলহীন তো ছিলেন না।
ছড়াটির দ্বিতীয় চরণ ‘সোনা নিন্দে পিদলে’। এর মানে পিতলেরা স্বর্ণের নিন্দায় মাতে। এখানে এক জড়বস্তু ‘সোনা’র গুণকীর্তন করতে গিয়ে আরেক জড়বস্তু ‘পিতল’-এর অপেক্ষাকৃত বৈগুণ্যের অবতারণা করা হয়েছে একেবারেই পাশাপাশি। অথচ তাতে খুব বোধগম্যভাবে কোনো এক গুণধর, সজ্জন ব্যক্তি বা ব্যক্তিত্বের ছায়াই যেন কোন ফাঁকে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে পাঠক বা শ্রোতার চোখেমুখে। সোনা বা স্বর্ণ পার্থিব মানুষের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রায় নিঃসন্দেহে মূল্যবান ধাতু। জনসমাজে এটির মনকাড়া আলংকারিক গ্রহণযোগ্যতা ছাড়াও তার সমুজ্জ্বল দীপ্তিও একটি খুব প্রত্যয়ী ভাববাচক দ্যোতক বটে। স্বর্ণের প্রভাবসঞ্চারী মূল্যমান ও ঔজ্জ্বল্যগুণ অনেকটাই প্রাকৃতিক। পিতল ও স্বর্ণের তুলনামূলক বিচারে স্বর্ণ তাই অধিকতর পক্ষপাতে ধন্য হবে, তাতে বাগবিতণ্ডার তেমন একটা অবকাশ নেই বললেই চলে। ঠিক একইভাবে সাধারণ মানুষের ভিড়ে উন্নত রুচি-সংস্কৃতিসম্পন্ন মানুষ তার অজান্তেই সমাজ-পরিসরে নিজের বা নিজেদের অগ্রগণ্যতা ও শ্রেষ্ঠত্ব ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম। তাতে নিম্ন বা মাঝারিমানের নেতৃত্ব দখলকারীদের মুখগুলো ম্লান হয়ে যায় কখনো সখনো এবং তারা মনোজ্বালা গোপন রাখতে না-পেরে উত্তম স্বভাবের মানুষের বিপক্ষে অহেতুক, ফেনানো সব কুৎসা রটিয়ে একধরনের স্বস্তি খুঁজে বেড়ায়। যা আত্মপ্রতারণার শামিল। কিন্তু লোকসমাজের ভেতরে আপাতত মূক ও বধির হয়ে তক্ষকের মতো চুপটি করে থাকা বুদ্ধিমান মানুষেরা ওই তুলনামূলক রূপক উক্তির মাধ্যমে একেবারে সহজভাবে এমন পরিস্থিতির মোকাবিলা করে যে ‘সোনা নিন্দে পিদলে’!
এ ছড়াটির তৃতীয় ও শেষ পঙক্তির ব্যক্ত বিষয়ও ভারি চমৎকার : ‘অমানুজ্যে মানুজ নিন্দে/ ঘি নিন্দে চিদলে’। এখানে এতক্ষণ ধরে রূপকের রঙে ঢেকে রাখা খাস বিষয়টাকে একেবারে হাটে টেনে এনে হাঁড়ি ভেঙে দেবার মতো ঘটনা হয়ে গেল। যে নিম্নরুচি ও ভ্রষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির মানুষেরা উচ্চ মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষের উপস্থিতি ও বা সংস্পর্শে ব্যক্তিত্বহারা, ক্লিশে ও করুণ হয়ে পড়ে আর আড়ালে সে উচ্চবোধ ও প্রজ্ঞাবানদের নামে আকথা-কুকথা কয়ে বেড়ায় তাদের সে বিদঘুটে, রুগ্ণ মনের অন্ধকার খুব জুতসইভাবে চিত্রায়িত হয়েছে ‘অমানুজ্যে মানুজ নিন্দে’ বাক্যে। এখানে উপমান ও উপমিত শব্দ দুটি হলো হলো ‘মানুজ’ ও ‘অমানুজ্যে’ (অমানুষ ও মানুষ) এবং ‘ঘি’ ও ‘চিদল’। অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে অমানুষ এবং ঘিয়ের সঙ্গে চিদল।
ঘি সুপরিচিত খাদ্যবস্তু। এটি একধরনের পরিশোধিত মাখন। শত শত বছর ধরে যা এশীয় রন্ধনপ্রণালি ও আয়ুর্বেদশাস্ত্রে ব্যবহৃত হয়ে আসছে অতিশয় সুনামের সঙ্গে। ঘি তৈরির সময় মাখন থেকে দুধের কঠিন অংশ (Milk Solids) সম্পূর্ণ ছেঁকে আলাদা করা হয়। ফলে ঘিয়ে ল্যাকটোজ (Lactose) ও কেসিন (Casein) থাকে না বললেই চলে। তাই যাদের দুধ বা দুগ্ধজাত খাবার খেলে সমস্যা হয় (Lactose Intolerance) তারাও নিশ্চিন্তে অনায়াসে ঘি খেতে পারে। শুষ্ক ত্বক ও ফাটা ঠোঁট নিরাময়, চোখের নিচের কালো দাগ দূর করতে আর উচ্চতাপের রান্নায় ‘ডিপ ফ্রই-এর জন্যে সাধারণ তেলের চেয়ে ঘি উত্তম ও নিরাপদ। খালি পেটে হালকা গরম পানি সহযোগে ঘি খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য নিরাময় হয় আর রাতে ঘুমানোর আগে গরম দুধের সঙ্গে এক চামচ ঘি খাওয়া মানে হাড়ের সন্ধিকে মজবুত করা। এসব শারীরিক উপকারিতার বাইরে ঘিয়ের একটি মনস্তাত্ত্বিক উচ্চবর্গীয় একটা ঠাটও আছে। যা ছড়াটিতে অন্তশায়ীভাবে লুক্কায়িত আছে— তা বোঝা যায় যখন ‘চিদল’ ঘিয়ের নিন্দা করছে বলে জানান দেয়া হচ্ছে। এটি লোকসমাজের আপাত নিরীহ মানুষের গভীর পর্যবেক্ষণ শক্তিকে যেমন সামনে আনে, তেমনি খাদ্যকেন্দ্রিক মনস্তত্ত্বকেও অনেকটাই খোলসা করে দেয়।
তবে এটির পাশেই উল্লিখিত ‘চিদল’-এর খানিকটা পরিচিতি প্রদান আবশ্যক বলে মনে হচ্ছে। কারণ, এটি সমতলের মানুষের কাছে তেমন পরিচিত খাদ্যদ্রব্য নয়। ‘চিদল’ পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী সমাজে প্রচলিত তরকারি বা সবজিরন্ধনে ব্যবহার্য, মুখরোচক ঐতিহ্যবাহী উপাদানবিশেষ। এটি তৈরির মূল উপকরণ হলো পাহাড়ি নদী বা ঝিরি থেকে ধরে আনা ছোটো চিংড়ি ও অন্যান্য ছোটোমাছ। এগুলোই ‘চিদল’-এর মূল উপাদান। ভালো করে ধুয়ে পরিষ্কার করা এই কুচো চিংড়ি ও অন্য ছোটোমাছগুলোকে রোদে আংশিকভাবে শুকানো হয় যাতে মাছের জলীয় অংশটুকু কিছুটা কমে আসে। এরপর এগুলোকে কাঠের বড় হামানদিস্তায় (চাকমা ভাষায় ‘উধল’ বা ‘বাইন’) অথবা শিলপাটায় ছেঁচে মিহি মণ্ড তৈরি করা হয়। এই মণ্ডকে একটি নির্দিষ্ট আধার বা পাত্রে কলাপাতায় মুড়িয়ে বাতাস না-লাগা ব্যবস্থায় বেশ কিছুদিন রেখে দিতে হয়। এই বদ্ধ অবস্থায় এতে প্রাকৃতিকভাবে ‘ফারমেন্টেশন’ বা গাঁজনপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এ রকম থাকতে-থাকতে ওতে একপ্রকারের তীব্র ঘ্রাণ ও স্বাদ তৈরি হয়। গাঁজন প্রক্রিয়া শেষে ওই মণ্ডকে আবারও রোদে শুকানো হয়। রৌদ্রতাপে এটি একসময় গাঢ় বাদামি বা কালচে আকার ধারণ করে। বিশেষ করে চাকমা পরবিারগুলো এই মণ্ডকে ছোটো ছোটো গোলাকার ও চারকোনো আকৃতিতে কেটে কেটে পাত্রে ভরে সারাবছর সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে। তাদের দৈনন্দিন জীবনের তেলছাড়া সেদ্ধ সবজিরন্ধনে এই ‘চিদল’ সামান্য পরিমাণে প্রয়োগ করা হয়, যা জিবে অতুলনীয় আস্বাদনের আনন্দ এনে দেয়। মজার বিষয় হলো, ছড়াটির এই অংশেই বলা হচ্ছে কিনা ‘ঘি নিন্দে চিদলে’! অর্থাৎ এমন স্বাদের চিদলই কিনা আবর ঘিয়ের নিন্দায় মেতেছে। কিন্তু ঘি কেন চিদলের কাছে নিন্দনীয় বস্তু হলো এ রহস্য উন্মোচন করতে হলে আমাদের আরও কিছুদূর যেতে হতে পারে।
ঘি অতীব উচ্চ স্বাদযুক্ত, কিছুটা অভিজাত ও মূল্যবান খাদ্যদ্রব্য। এখনকার সময়ে বিশুদ্ধ ঘিয়ের খোঁজ পাওয়া নিশ্চয়ই এক দুরূহ অভিযানের নামান্তর। সেকালেও মনে হয় অবস্থাটা এমনই ছিল। নইলে ঘিয়ের এমন খান্দানি খাতির কেন সে কবেকার আমলেও! সে যাক, ঘরে ‘চিদল’-এর স্বাদু উপস্থিতি তো আছেই। তার লালাঝরানো আকর্ষক ঘ্রাণ ও গুণের ব্যাপারেও কোনো বাদ-বিসম্বাদ নেই কোথাও। এমন ‘চিদল’ভরা ঘরেও কিন্তু ঘিয়ের উপস্থিতি চিদল-এর প্রভাবকে খানকিটা ম্লান করে দিতে পারে সহজেই। ঘরের সকলে চিদল-এর স¦াদ ভুলে ঘিয়ের রসনালোলুপ সান্নিধ্য পেতে হুমড়ি খেয়ে পড়তে পারে ঘিয়ের ভাণ্ডে। এমন দৃশ্য তো সচরাচর। এভাবে স্বাদের ‘চিদল’ ঘিয়ের সঙ্গে যুদ্ধে হেরে যায়। সুতরাং ঘিয়ের উপস্থিতিতে ‘চিদল’-এর মনস্তাপের সমাচার লোককবির অগোচরে রবে কেন? তাই রসিক লোককবি বলছেন : ঘি নিন্দে চিদলে ..
:: তথ্যসূত্র : ১/ ‘চাকমা জাতি (জাতীয় চিত্র ও ইতিবৃত্ত : সতীশচন্দ্র ঘোষ। প্রথম সংস্করণ ২০০০, কলকাতা। ২/ ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম : সুপ্রকাশ রায়।প্রথম প্রকাশ : ১৯৬৬, কলকাতা।
