দু’চোখে বিস্ময়ে নিয়ে প্রশ্ন করে আমরিন, ‘আব্বা? আমার ঘরে এরা কারা? কোত্থেকে আসছে?’
সিগাটেরে টান দিয়ে ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে আমরিন নাহার লতার শ্বশুর খায়রুল বাশার জবাব দেয় আয়েশের সঙ্গে, ‘নতুন ভাড়া এসেছে ওরা।’
বিস্ময় নয়, রীতিমতো চমকে ওঠে লতা। ‘আপনি আমার বাসা ভাড়া দিয়েছেন? কে আপনাকে আমার বাসা ভাড়া দিতে বলেছে?’ প্রায় চিৎকার করে ওঠে পুত্রবধু লতা।
কোলে দুই বছরের কন্যা সুখপাখি। সুখপাখির হাতে খেলনা, খেলনা নিয়ে আপন মনে খেলছে। আমরিন নাহার লতার চিৎকারে বাসার অন্য রুমে যারা ছিল, বের হয়ে আসে সামনে। বাথরুমে কাপড় ধুচ্ছিল মতিজান বিবি, কাপড় ধোয়া বাদ দিয়ে বাধরুমের দরজার সামনে দাঁড়ায়। বিছনায় শুয়ে ছিল লতার শ্বাশুড়ি মেহবুবা খানম, পুত্রবধুর চিৎকারে কাজের ছেলে রবুর হাত ধরে হুইল চেয়ারে চড়ে এসে দাঁড়ায় সামনের চিলতে বারান্দার দরজায়। বড় মেয়ে কাঞ্চন বেড়াতে এসেছে বাপের বাসায়, শুয়েছিল বেডরুমে। চেঁচামেচি শুনে শোয়া থেকে উঠে বের হয়ে সামনে দাঁড়ায়। মোটামুটি একটা ঘরোয়া সমবেশ ঘটেছে দুই তিন মিনিটের মধ্যে খায়রুল বাশারের ডয়িংরুমের সামনের লম্বা করিডোরে।
‘বাসা তোমার মানে কী?’ আস্তে জিজ্ঞেস করে বাশার।
‘এই রুমে তো আমি, আপনার ছেলে, এই নাতনী নিয়ে থাকি না? যখন থাকি, তখন তো আমার রুম। আপনার ছেলে তিন মাসের জন্য দেশের বাইরে গেছে, এই ফাঁকে আপনি আমাকে বাসা ছাড়া করার পাঁয়তারা করছেন? আপনি কী মানুষ? মুরব্বি হয়ে আপনি এমন করছেন কেন?’ এগিয়ে যায় ড্রয়িংরুমের পাশে তিনশত আশি বর্গফুটের রুমটা দিকে। দরজায় অপেক্ষারত নতুন ভাড়া আসা সজীব রহমানের স্ত্রী ময়না দাঁড়িয়েছিল। ময়নার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ঘটনা দেখেছে চার বছরের ছেলে সিমন। ময়নার সামনে এসে কড়া গলায় জিজ্ঞেস করে লতা, ‘এ্যাই মেয়ে তুমি আমার বাসায় ঢুকেছ কেন?’
ময়না হাসে। ‘এটা আপনার বাসা? আমি তো জানি এটা বাশার চাচার বাসা।’
‘বের হও, এটা আমার বাসা!’ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে লতা। কোলের মেয়ে সুখপাখিকে নামিয়ে দিয়ে ময়নাকে ঠেলে ঘরের মধ্যে ঢোকে। ঢুকে আরও অবাক, মাস দুয়েক আগে রেখে যাওয়া রুমের মধ্যে কিছুই নেই। এক দৌড়ে ফিরে আসে সামনের করিডোরে। দাঁড়ায় শ্বশুরের সামনে রুদ্র মুর্তিতে, ‘আব্বা আমার রুমের জিনিষপত্র কই?’
‘বিক্রি করে দিয়েছি।’
মাথায় ডান হাত দিয়ে মুখ অবশ করে বড় বড় চোখে প্রশ্ন করে, ‘আপনি আমার জিনিষপত্র বিক্রি করে দিয়েছেন?’
মাথা নাড়ে বাশার। ‘বিক্রি করে দিয়েছি।’
মেহবুবা খানম অসুস্থ শরীরে বলে, ‘কেন ঝামেলা বাড়াচ্ছ, মুকুলের বাপ। বলে দাও, ওদের জিনিষপত্র গুদামঘরে রাখা আছে।’
‘গুদামঘরে আমার জিনিষপত্র? হায়, কতো জামা কাপড় ড্রেসিং টেবিল, দেশি বিদেশি প্রসাধন সামগ্রী ব্যাগ…আমি মামলা করব, পুলিশ ডাকব, আমি আপনাকে ছাড়ব না, ছাড়ব নাভ’ আমরিন নাহার লতা কন্যাকে কোলে নিয়ে দ্রুত বের হয়ে যায়।
বাশার ভাবছিল, কী করে মেয়েটাকে থামানো যায়! কিন্ত মেয়েটি নিজেই থেমে এবং চলে যাওয়ায় হাফ ছাড়ে। শুরু থেকেই ভেবেছিল বাশার, পরিস্থিতি জটিল হবে, কিন্ত পুত্রবধূ এমন করে চেঁচাবে, ভাবেনি। লতা চলে যাবার পরপরই ঢোকে পাশের ফ্লাটের মালিক শিবরাম রায়। ‘কী ব্যাপার ভাই, চেঁচামেচি কিসের?’
‘কিছু না, মুকুলের বৌ এসেছিল তো!’ অনেকটা নির্ভার ভঙ্গিতে জবাব দেয় খায়রুল বাশার। ‘আসুন বসুন।’
‘তখনই আমি তোমাকে নিষেধ করেছিলাম।’ হুইল চেয়ারে হেলান দিয়ে বলে মেহবুবা খানম। ‘ছেলের সঙ্গে পারলেও ছেলের বৌয়ের সঙ্গে পারবে না। এখন সামলাও।’
‘ভাবি, আমিও বলেছিলাম ছেলেকে বাসায় রাখতে চান না, ভালো। কিন্তু এভাবে গোপনে না, সরাসরি সামনাসামনি আলোচনা করে বিদায় করেন। কেউ কি ঢাকা শহরের একেবারে বুকপয়েন্টে পল্টনের মধ্যখানে দশতলা বিশাল বিল্ডিংয়ের আটতলার এমন সুন্দর রুম ছাড়তে চাইবে? তাও থাকছে প্রায় বিনা ভাড়ায়।’
রুমের মধ্যে থেকে দুটো চেয়ার এনে সামনে রাখে কাঞ্চন, ‘থাকার সঙ্গে আবার খাওয়া দাওয়াও ফ্রি, রাজাবাদশার জীবন!’ ফোড়ন কাটে ও।
‘পুত্র যখন, খাবে না ফ্রি? আদর দিয়ে মাথায় তুলেছে তোর মা।’ চেয়ারে বসে সিগারেটে সুখের টান দিয়ে ধোয়া ছাড়ে খায়রুল বাশার।
‘আমি না হয় আদর দিয়ে মাথায় তুলেছি, কিন্তু ছেলের পছন্দের রাজকন্যাকে ঘরে তুলে এনেছে কে?’
‘ভাবি, এটা তো দাদার দোষ না।’ শিবরাম রায় মাথার ডান পাশের পাকা চুল চুলকাতে চুলকাতে বলে। ‘ছেলে পছন্দ করেছে। মেয়েও দেখতে চমৎকার, মাঝখান থেকে আপনিই বাধা দিয়েছিলেন…’
অনেকটা আক্ষেপের স্বরে বলে মেহবুবা খানম, ‘দেবো না তো কি করব? ওই মেয়ে যেদিন বাসায় আসল মুকুলের সঙ্গে, ভাবসাব দেখেই আমি বুঝেছি, এই মেয়ে আমার নাড় কাটবে। আমার সন্তান থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। কিন্তু আমার কথাতো আপনারা শুনলেন না। আপনি আর ওর বাপ মিলে বিশিষ্ট ব্যাবসায়ীর মেয়েকে ঘরে তুলে আনলেন।’
‘আমিও বুঝতে পারিনি,’ জানালার দিকে চোখ রেখে আপন মনে অনেকটা ক্ষোভের সঙ্গে বলে বাশার। ‘মেয়েটাকে দেখে আমার খুবই আন্তরিক মনে হয়েছিল। দুই তিন দিন বাসায় এসে এমন আন্তরিকভাবে মিশল, কথা বলল, এমন কী নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াল, আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। এমন কী আমি রঙ চা পছন্দ করি, চমৎকার সুস্বাদু রঙ চা বানিয়ে খাইয়েছে।’
‘রঙ চা খেয়েই তুমি ছেলের সঙ্গে আমরিনের বিয়ে দিতে রাজি হলে?’ অবাক কণ্ঠে প্রশ্ন করে মেহবুব খানম।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে খায়রুল বাশার। ‘মুকুলের মা, তুমি তো আমাকে জানো, জীবনে বেশি কিছু আশা আমি করিনি। নিন্মমধ্যবিত্তের জীবনের কোটারি পার হয়ে, ধুকে ধুকে জীবনের সিঁড়ি বেয়ে এখানে এসে পৌঁছেছি। আমি কী ছেলেমেয়ের কাছে বেশি কিছু চেয়েছি? চাইনি। মেয়েটা যখন বাসায় এল, সত্যি খুব খুশি হয়েছিলাম। তুমিও হয়েছিলে। তোমার খুশির কারণ ছিল কী আমি জানি।’
‘কী কারণ ছিল?’
‘একজন বড় ব্যবসায়ীর মেয়ে আসবে তোমার ঘরে, তোমার একটু অহংকার হবে। সবাইকে বলতে পারবে, অমুক ব্যবসায়ী, মাঝে মধ্যে টিভিতে দেখা যায়, সোলেমান আলীর মেয়ে আমার ছেলের বৌ। এইটুকুই চেয়েছিলে, হাজার কোটি টাকার স্বার্থের পৃথিবীতে এটা কোনো অপরাধ নয়, আমি জানি।’ সিগারেটে শেষ টান দিয়ে ফেলে দেয় খায়রুল বাশার।
‘তুমি কিন্ত তোমার কথা শেষ করনি,’ দুজনার মধ্যে ঢুকে পড়ে শিবরাম রায়।
‘ঠিক, আমি খুব অল্পে সন্তুষ্ট থাকি সব সময়ে। পরিবার নিয়ে আমার খুব ছোট ছোট স্বপ্ন ছিল। যেমন ধরো বড়ো মেয়ে কাঞ্চনকে নিয়ে আমার খুব স্বপ্ন ছিল, ও গানের শিল্পী হবে। ক্লাস থ্রিতে পড়বার সময়ে হারমোনিয়াম কিনে দিলাম। গানের স্কুলে ভর্তি করালাম। মনে মনে খুব আশা ছিল কাঞ্চন সকালে গলা সাধবে, আমি ঘুম থেকে উঠে ওর গলা শুনব আর চা খাব…বলো শিবরাম, আমি কী খুব বড় স্বপ্ন দেখেছিলাম?’ আবেগে গলা ধরে আসে খায়রুল বাশারের।
পরিস্থিতিটা কেমন ভারী হয়ে ওঠে। দরজায় দাঁড়ানো কাঞ্চন সরে যায় ভেতরে।
‘কিন্ত হলো না কেনো?’
‘শত চেষ্টা করেও কাঞ্চনের মধ্যে গলা সাধার বা গান শেখার কোনো আগ্রই তৈরী করতে পারিনি। পাথরে তৈরি এক অবাক মেয়ে আমার!’
‘মানে তোমার মেয়ের মধ্যে গান শিখবার কোনো ইচ্ছেই ছিল না, তাই তো?’
শিবরামের প্রশ্নে মাথা নাড়ায় খায়রুল বাসার। ‘মেয়েটিকে নিয়ে আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। পরে যখন দেখলাম কোনো কিছু হওয়ার নয়, ওর জন্ম হয়েছে খাওয়া ঘুম আর গল্প করে সময় কাটানোর জন্য, তখন সব ছেড়ে দিয়েছি। তো অনেক বছর পর মুকুলের প্রেমিকা লতা মেয়েটি বাসায় আসলে আমার মনটা ভরে উঠেছিল। কারণ, দুই মেয়ের বিয়ে দিয়ে আমরা দুজনে সংসারে আছি। মুকুল তো সারাদিন রাত পড়াশোনা আর চাকরি নিয়ে বাইরে থাকে। বাসায় থাকলেও আমাদের সঙ্গে মন খুলে কোনো বিষয়ে আলাপ করে না। যখনই যতটুকু সময় বাসায় থাকে দরজা বন্ধ করে রাখে। অনেকবার বলেছি, দরজা সব সময়ে বন্ধ রাখিস না। কিন্তু কখনো শোনে না, নিজের মন মর্জি মতো চলে। একটা অবরুদ্ধ সময়ের মধ্যে বাস করছিলাম নাকমুখ খিচিয়ে, নিজের সংসারে। তখন এই মেয়েটিকে দেখে, ওর হাতের তৈরি রঙ চা খেয়ে মনে মনে খুব সুখ পেয়েছিলাম। ভেবেছিলাম- সংসারে পুত্রবধু হয়ে এলে অন্তত ওর হাতের তৈরি চা খেতে খেতে গল্প করতে পারব। নাতী নাতকুর হলে সারাদিন হৈ হুল্লোড় করে সময় কাটিয়ে দেব। কিন্তু…’ হঠাৎ থেমে যায় বাশার।
‘আমি তোমাকে তখনই বলেছিলাম বেশি আশা করো না পরের মেয়ের কাছ থেকে।’ পানের খিলি মুখে দিতে দিতে মেহবুবা খানম বলে। ‘নিজের সন্তানরাই যখন বাপ মায়ের দুঃখ ক্লেশ বোঝে না, তখন পরের কাছ থেকে কিছু চাওয়া ঠিক না।’
‘ফুলমণি,’ যখন আবেগে থাকে খায়রুল বাশার স্ত্রীকে ফুলমণি ডাকে। ‘জীবনে তেমন কিছু পাইনি তো, তাই ছোট ছোট বিষয়ে খুব লোভ হয়। এই যে ছেলের বৌয়ের হাতে তৈরি দিনের মধ্যে এককাপ রঙ চা খাওয়ার ইচ্ছে কী খুব বিলাসিতা? খুব বড় কিছু? অনেকে শুনলে হাসবে, বলবে- লোকটা পাগল। আমি অস্বীকার করছি না যে, আমি পাগল না। আমি পাগলই। নইলে এক কাপ রঙ চায়ের জন্য ছেলের বিয়ের পক্ষে রাজি হয় কোনো বাপ? তুমি তো জানো বৃষ্টির দিনে আমি বারান্দায় বসে বা দাঁড়িয়ে চা খেতে খুব পছন্দ করি— এটুকুই বিলাসিতা আমার। সমাজ সংসার ছেলে মেয়ের কাছে এইটুকুও চাইতে পারব না?
‘আমার ঘুম পেয়েছে,’ মেহবুবা খানম বিষন্ন মনে হুইল ঘুরিয়ে বিছনার কাছে যায়। আসলে চোখের পানি লুকানোর জন্য দূরে চলে যায়। নিজের মেয়েদুটোকে গড়ে তুলতে না পারার তীব্র ব্যর্থতা মানুষটাকে কুরে কুরে খায়। সে ব্যর্থতা থেকে ছেলের বৌয়ের কাছে একটু মমতা, সামান্য স্নেহ চেয়েছিল।
আমরিন নাহার লতার সঙ্গে মুকুলের বিয়ের সময়ে বাশার খুব যত্ন করে ছেলেবৌয়ের ঘরটা সাজিয়ে দিয়েছে। মুকুল যদিও বড় বেতনে ব্যাংকে চাকরি করে, তবু ওর কাছ থেকে টাকা নেয়নি। নিজের পেনশন আর ব্যাংকে জমানো টাকা দিয়ে ঘরটা সাজিয়েছে। সাজানোর সময়ে লতার সঙ্গে আলাপ করেছে বাশার, অনেকটা শিশুর মতো আনন্দ পেয়েছে । বিয়ের প্রথম কয়েক মাস খুব ভালেই কাটল। সকালে নিজের হাতে নাস্তা বানিয়ে সকলকে নিয়ে নাস্তা খেত লতা। রবুর মা থালাবাটি পরিষ্কার করত। দুপুরেও রান্নার চেষ্টা করত— কিন্ত পারত না। তখন রবুর মা মাছ মাংস তরকাটি কেটে দিলে হুইল চেয়ারে বসেই রান্না করত মেহবুবা খানম। পিছনে দাঁড়িয়ে থাকত লতা। দেখত রান্না।
‘তুমি দাঁড়িয়ে কেনো লতা? যাও, নিজের কাজ করো মা।’ হাসি মুখে পুত্রবধুকে প্রশয় দিত। মেয়েটি যেত না, দাঁড়িয়ে থাকত। বলত, ‘ আপনি কেমন করে রান্না করেন দেখি। একদিন তো আমাকে রান্না করতেই হবে।’
‘সে ঠিকই বলেছ।’
মেহবুবা খানম ভেতরে ভেতরে লজ্জিত হতেন। এমন আন্তরিক মেয়েটাকে আমি ভুল বুঝেছি?
সে মেয়েটা পাল্টে যায় ছয় মাসের মধ্যে। শুরুর দিকে সকালে আর নাস্তা বানাত না, বাশার অপেক্ষা করত, শেষে দোকান থেকে রুটি ভাজি এনে সকালের নাস্তা হতো। আগের মতোই মুকুল মা বাবার কাছে আসে না। প্রায়ই বিকেলে বা সন্ধ্যায় মুকুল বাসায় এসে লতাকে নিয়ে বাইরে চলে যায়। রাতে খেয়ে চলে আসে, মা বাবাকে কিছুই বলে না। বিয়ের আগে মাসে মাসে বাজার করে আনত, যখন প্রয়োজন হলে টাকা পয়সা দিয়েছে। ধীরে ধীরে টাকা দেয়া বন্ধ করে। বাজারের বিষয়েও উদাসীন হয়ে যায়। চার রুমের একটা ফ্ল্যাটে থাকার মধ্যে মাঝে মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হওয়াটাও বন্ধ, কথা তো পরের ব্যাপার। পুরো বিষয়টা নিয়ে খায়রুল বাশার আর মাহবুবা খানম অনেক ভেবেছে- কিন্ত পরিবর্তনের কোনো সূত্র আবিষ্কার করতে পারেনি। এ কেমন সংসার? মাহবুবা খানম ভেবে পায় না- এতো যত্ন, এতো আদর, স্নেহ দিয়ে গড়া ছেলেমেয়েরা এমন পাল্টে যায় কেন? মেয়েদুটো তবু খোঁজ খবর নেয়, আসা যাওয়া করে কিন্ত একমাত্র ছেলে বিয়ের পর বৌয়ের ভেড়া হয়ে গেলো? কই, আমি তো কখনো আমার শ্বশুর শাশুড়ির যত্ন কম করিনি। বরং বেশিই করেছি। চারপাশের মানুষ বলেছিল, তুমি যেভাবে শ্বশুর শাশুড়ির সেবা করছ, দেখবে বয়স হলে তুমিও সেবা পাবে। হাসে মাহবুবা খানম, কই কী পেলাম? মাঝখান থেকে বোকা লোকটা কষ্ট পায়। কিন্তু বোকা লোকটা এইবার এমন একটা খেলা খেলল, আমি অবাক।
মাস খানেক আগে মুকুল এসে বলল, ‘মা আমি তিন মাসের জন্য মালয়েশিয়া যাচ্ছি অফিসের একটা ট্রেনিংয়ে। বাসায় তুলি আর সুখপাখি থাকবে, ওদের দেখে রেখো।
পেছন থেকে উত্তর দেয় ওর বাপ, ‘ওদের দেখে রাখতে হবে কেন?’
‘কী যে বলো না আব্বা! সুখপাখি ছোট না?
তোদের সুখপাখি কী আমার কাছে, ওর দাদির কাছে আসে? বাসায় থাকলে সারাক্ষণ রুমের মধ্যে আটকে রাখে তোর বউ। অথচ ছোট মেয়েটা আমার সঙ্গে বাইরে গেলে, ছাদে গেলে খুব হাসিখুশি থাকে। কিন্তু তোর বউ সুখকে আসতে দিতে চায় না।
‘কেমনে দিবো?’ রুমের ভেতর থেকে নেমে আসে ছোট বারান্দায় লতা। ‘আপনারা মেয়েটার কানে কানে আমার বিরুদ্ধে বদনাম করেন।’
মাত্র দু’বছরের মেয়ে বদনাম বুঝতে পারে? অবাক খায়রুল বাশার। এ কোন মেয়েরে বাবা?
‘শুনলে তোমার বাবার কথা? আমার বিরুদ্ধে কেমন কথা বলছে? অথচ তুমিই বাজার করে আনো।’
হাসে মেহবুবা খানম, মুকুলতো বাজার করে না। টাকাও দেয় না গত ছয় সাত মাস ধরে। তোমার শ্বশুরের পেনশনের টাকায় বাসায় কোনো রকমে বাজার চলে।
মুকুলের দিকে চটে ছুটে আসে লতা, ‘তুমি বাজারের টাকা দাও না? বাজারও করো না? সেইজন্য এতো বাজে খাবার খেতে হয়?’
‘তুমিই তো খরচ কমাতে বললে,’ বলেই স্ত্রী আর বাবা মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে যায় সোনার বাংলা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার আহমেদ মুকুল। কারণ, বুঝে যায় স্ত্রীর পরিকল্পনা প্রকাশ হয়ে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে লতা রুমের মধ্যে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়। দুপুরের সময়ের এই কয়েকটা কাক মাথার ওপর উড়তে উড়তে কা কা ডাকতে থাকে। একটা কাক তো দলছুট হয়ে ছাদের ওপর বসে ডাকতে থাকে কর্কশ স্বরে। মেহবুবা খানমের বুকটা হিমশীতল হয়ে যায়, অজানা কোনো দুর্ঘটনার আশংকায়।
আহমেদ মুকুলের মালয়েশিয়া চলে যাবার পর রাতে ঘুমানোর সময়ে বাশার জানায়, ‘ফুলমণি আমি রুমটা ভাড়া দিয়েছি।’
বিছনায় শোয়ার আগে রাতের শেষ পানটা মুখে দিয়েছে মাত্র মেহবুবা, ‘কোন রুম ভাড়া দিয়েছ?’
‘পাশের রুমটা, আট হাজার টাকা মাসে ভাড়া— ছোট একটা পরিবার। স্বামী স্ত্রী আর একটা শিশু।’
পান চিবানো বন্ধ মেহবুবার। ‘এটা কী করছো? লোকে শুনলে কী বলবে? কখন দিয়েছ?’
‘শোনো ফুল, শান্ত হও। বিচলিত হয়ো না। মুকুল মালয়েশিয়া যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমি দারোয়ানকে বলে রেখেছি ছোট একটা পরিবারের কাছে রুমটা ভাড়া দিতে চাই। গত পরশু তুমি পারুল আপার বাসায় গেলে না, থাকলে সারাদিন, সে সময়ে প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরি করা এক দম্পতি এসেছিল। দারোয়ান ইউনুস ফোন করলে, উপরে আসতে বলি। পরিবারটা দেখে আমার ভালোই লাগে—’
মুখের পান ফেলে দিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকায় মেহবুবা, তুমি এটা কী করলে? মান সন্মান সব ধূলোয় মিশিয়ে দিলে? যে শুনবে সেই ধিক্কার দেবে তোমাকে, আমাকে।
হাসে খায়রুল বাশার মিটি মিটি।
‘তুমি হাসছ?’ বিস্মিত মেহবুবা খানম।
‘ফুলমণি, চিরকাল মান সন্মানের ভয়ে বাবা মা হওয়ার অপরাধে লোন শোধ দিয়ে যেতেই থাকব? বাবা মায়ের কোনো সন্মান নেই? মা বাবার কোনো ইচ্ছে আশার মূল্য নেই? তোমাকে বলিনি ফুল, ব্যাংকে আমার টাকা নেই? আর মাত্র এগার হাজার টাকা আছে? পেনশনের উনিশ হাজার, ভাড়া আট হাজার, মিলে সাতাশ হাজার টাকা আমাদের প্রতিমাসের পুঁজি। ফ্ল্যাটের জন্য প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা গেলে কত থাকবে? চব্বিশ হাজার টাকা। তোমার আমার ডাক্তার ওষুধে খরচ পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা…। থাকবে কত? চাল ডাল মরিচ নুন পেয়াজ আদা তরকারি মাছ মাংস ডিম মেহমান মিলে পারবে সংসার চালাতে?’
মেহবুবা খানমের মাথাটা একেবারে ফাঁকা হয়ে গেছে- সংসার জীবনে বত্রিশ বছরে মানুষটাকে সোজা বাংলায় উজবুক মনে হতো, সেই উজবুক মানুষটা সংসারের এমন নিপাট হিসাব সামনে রাখল?
‘অথচ তোমার প্রিয় পুত্র মাসে বেতন পায় দেড় লাখ টাকা। আজ পর্যন্ত তোমার হাতে দশটি হাজার টাকা দিয়ে বলেছে, মা রাখো। তোমার মতো খরচ করো। এই ছেলের জন্য কি না করেছ, ফুলমণি? আমি আমার সাধ্য মতো শোধ নিতে চাই। তুমি, সমাজ যা ইচ্ছে বলুক— মাত্র তো আট হাজার টাকা। আসুক আমার হাতে।
না, খায়রুল বাশারের প্রিয়তম স্ত্রী, প্রিয় ফুলমণি এবার কোনো প্রতিউত্তর দেয় না। দিতে পারে না। চুপচাপ বিছনায় শুয়ে পড়ে। লাইট নিভিয়ে শুয়ে পড়ে বাশার স্ত্রীর পাশে। হালকা অন্ধকারের মধ্যে তাকিয়ে বুঝতে পারে, নি:শব্দে কাঁদছে আহমেদ মুকুলের মা মেহবুবা খানম। স্ত্রীর শরীরের ওপর ডান হাতটা রাখে বাশার। নিজের চোখেও জল নেমে আসছে নি:শব্দে। কেনো এই নিবিড় নি:শব্দ কান্নার তোড় নেমে আসছে বুকের অতলান্ত গভীর থেকে? সন্তান তো আত্মর প্রতিধ্বনি। রক্তের মানচিত্র। অনুভব সত্তার প্রিয় পবিত্র ফুল। সে সন্তানরা এমন হয় কেন? সব পরিবারে হয়? আমাদের তিনটি সন্তান— একটা সন্তানও অনুভব বা আশার কাছাকাছি নয়। বড় মেয়ে কাঞ্চন ইন্টার পাশ করেই পাশের বাসার এক ভাড়াটে ছেলের সঙ্গে পালিয়ে বিয়ে করেছে। সেই বিয়ের জের এখনও টানতে হচ্ছে— বছরের আট নয় মাস বাপের বাসায় থাকে, বাচ্চাসহ। ছোট মেয়ে দিলরুবার বিয়ে হয়েছে বছর চারেক আগে, কিন্তু দু’বছরের মাথায় নিজেই ডির্ভোস দিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে মিরপুরে একটা ক্যাফে চালায়। আয় খারাপ না, কিন্ত যোগযোগ নেই বললেই চলে। হঠাৎ তিন চার মাস পর আসে ঝড়ের মতো, সারাদিন খায় আর ঘুমায়। তিন চার মাস পরে যেভাবে এসেছিল, সেভাবেই চলে যায় কাউকে কিছু না বলে।
মেহবুবা বলেছে, ‘যে ছেলেটার সঙ্গে থাকিস, ওকে বিয়ে করে নে।’
‘নাহ, কোন শালাকে বিয়ে করব না।’ মোবাইলে চোখ রেখে জবাব দেয় দিলরুবা। ‘বিয়ে মস্ত ঝামেলা। শালা পুরুষেরা প্রেমিক থেকে স্বামী হলেই মহাজন হয়ে বসে। ওদেরকে আর সে সুযোগ দেয়া যাবে না। এ জীবনে আর বিয়ে নয়।’
‘তোর বাবা কষ্ট পাচ্ছে তোর জন্য।’
‘জানি, কিন্তু আমার কিছু করার নাই। যে জীবনের মধ্যে ঢুকে গেছি, বের হতে পারবো বলে মনে হয় না মা।’
কান্না ছাড়া বাবা মা কী করতে পারে!
তিন মাস পরে দুপুরের পরই বাসায় আসে আহমেদ মুকুল, আমরিন নাহার লতা। সুখপাখিকে আনেনি। মুকুল ভীষণ গম্ভীর। ফোনে আগেই জানিয়েছিল পাশের ফ্ল্যাটের শিবরাম রায়কে। আর সঙ্গে নিয়ে এসেছে মেহবুবা খানমের ছোট ভাই, মুরশিদ আলমকে। মুরশিদ আলম বেটে ধরনের মানুষ। শরীরের তুলনায় মাথার সাইজটা বড়। কিন্তু বুদ্ধি বিবেচনার পরিমান বেজায় কম। বাপের রেখে যাওয়া জমিতে বাড়ি করে ভাড়া তোলে আর খায়। আর সরকারি দল করে সবসময়ে। অবাক ঘটনা— আহমেদ মুকুল খুব পছন্দ করে মাথা মোটা, ঘাড় ত্যাড়া মোরশেদ মামাকে।
‘দুলাভাই, এইটা কোনো কথা হলো, নিজের ছেলের ঘর ভাড়া দিয়েছেন?’ চড়া গলার স্বর। ‘ছেলেটা যখন বিদেশে, তখন এই কাজ করেছেন, আপনি তো এমন মানুষ না। ভাড়াটিয়াদের বের করে দেন— ওরা থাকুক, প্রতি মাসে দশ হাজার টাকা করে দেবে আপনাদের।’
‘আপনি সব শালিসি করে দিলে, আমাকে ডেকেছেন কেন? সরাসরি প্রশ্ন তোলে শিবরাম রায়। ‘আগে তো জানতে চাইবেন, কেন ছেলের রুম বাইরের মানুষদের ভাড়া দিয়েছে বাশার ভাই?’
‘পিতাপুত্রের মধ্যে ঝগড়া হয় না?’ পাল্টা প্রশ্ন করে মোরশেদ।
‘শোনো মোরশেদ, আমি যা করেছি ঠিকই করেছি। যে ছেলে একই ছাদের নিচে থেকে বাবা মায়ের সঙ্গে সারা দিনে, সপ্তাহে একটা কথাও বলে না, সে ছেলের কাছে ভাড়া দেব কেন? ছেলে, ছেলের বৌয়ের চেয়ে আমার ভাড়া প্রতিবেশী অনেক ভালো। মেয়েটি আমাদের ঘরে আসে, গল্প করে। তোমার আপার অনেক কাজ করে দেয়। আমার চা বানিয়ে দেয়— আর কী চাই?’
‘সন্তানের চেয়ে বড় হয়ে গেল বাইরের মানুষ?’ চিৎকার করে মুকুল।
‘ওই মেয়েটাই সব সর্বনাশের মূল,’ স্বামীকে সার্পোট করে লতা পাশে দাঁড়িয়ে। লক্ষ্যভেদ করে দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা সিমনের মা ময়নাকে দেখায় আড়চোখে।
মুকুল এগিয়ে যায়। ‘আপনি তো সব শুনছেন। এটা আমাদের বাসা, আপনি চলে যান ‘
‘না, ময়না যাবে না। বরং তোরা তোদের আসল বাসায় চলে যা।’ খুব আস্তে কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে বলে খায়রুল বাশার।
‘আসল বাসা?’
হাসে খায়রুল বাশার। ‘তোর শ্বশুরের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে পল্টনে মাস চারেক আগে। সোলেমান সাহেব আমাকে জানিয়েছে, আমি আমার মেয়ে জামাইকে পনেরো শ বর্গফুটের বিশাল বাসা দিয়েছি মোহাম্মাদপুরে। খুব শীঘ্রই ওরা উঠে যাবে। আপনার বাসাটায় ওরা থাকবে না। তোর শ্বশুর যে তোদের এতোবড় একটা বাসা উপহার দিয়েছে, আমাকে, তোর মাকে জানিয়েছিস? জানাসনি, গোপন রেখেছিস। কেন? আমি আর তোর মা গিয়ে উঠতাম তোর শ্বশুরের দেয়া বাসায়? কোন চোখে আমার সামনে এসেছিস? লজ্জা করে না তোর?’
‘কী বললে তুমি?’ শুরু থেকে চুপচাপ থাকা মেহবুবা আক্ষেপের সঙ্গে জিজ্ঞেস করে। ‘মুকুলের শ্বশুর ওদের এত বড় বাসা দিয়েছে? কই বললো না তো আমাকে?’
‘কেমনে বলবে? দুধ কলা আদর মমতা স্নেহ দিয়ে কালসাপ পুষেছ তুমি, তোমার সঙ্গে আমিও।’
‘মোরশেদ বসা থেকে দাঁড়ায়। ‘মুকুল ঘটনা সত্যি?’
‘সত্যি মামা।’ মিন মিন স্বর মুকুলের। ‘বাসায় উঠে আপনাদের দাওয়াত দেয়ার প্ল্যান ছিল আমার আর লতার।’
‘মিথ্যা কত চমৎকার করে বলে আমার প্রিয় পুত্র!’ বেদনার্ত গলা খায়রুল বাশারের। ‘এই হারামজাদা, তুই তো ওই বাসা ত্রিশ হাজার টাকায় ভাড়া দিয়েছিস। তোর শ্বশুরের সঙ্গে গত সপ্তাহে দেখা হলে, আমি খোঁজ খবর নিলে খুব হাসি মুখে বলল, জানেন বেয়াই জামাই মুকুল খুব হিসেবী। আড়াইজন মানুষের জন্য অতোবড় ফ্ল্যাটের দরকার কী? বাপের বাড়ি আর শ্বশুরের বাড়ি মিলিয়ে কয়েকটা বছর চলে যাক, পরে দেখা যাবে।’ ভদ্রলোক হাসতে হাসতে আরো বলল, ‘তুই ষাট লাখ টাকা অ্যাডভান্স দিয়ে আরও বড় একটা ফ্ল্যাট কিনছিস নিকেতনে। আর তোর বাবা মাকে দশটি হাজার দিতে খুব কষ্ট!’
সবাই চুপ।
‘শোন মুকুল, তোর যখন তিন বছর বয়স তখন মারাত্মক জ্বর হয়েছিল, তখন অনেক ডাক্তারের কাছে নিয়েছি, অজস্র ওষুধ খাওয়ানো হয়েছে। কিন্ত জ্বর নামে ঠিকই কিন্ত কয়েকঘন্টা পর আবার আসে, ডাক্তাররা বিচলিত— কিন্ত তুই বেঁচেছিস একমাত্র ওই মহিলার জন্য। দিনরাত তোকে বুকে নিয়ে বসে থাকত— দিনে রাতে ঘুমোনোর সময়েও তোকে বুকে রেখে ঘুমাত। একমাত্র ওর যত্নে আর কান্নার কারণে খোদা তোকে ফিরিয়ে দিয়েছিল। আমি তো বাপ, নাই বা দাম দিলি, কিন্তু মাকে তো এভাবে অপমান করতে পারিস না।’ মাথা নাড়ায় খায়রুল বাশার। ‘পারিস না। আমার মনে হয়, তোর এই বাসা থেকে চিরকালের জন্য চলে যাওয়াটাই ভালো। এতো তোরও মুক্তি, আমাদেরও।’
‘তুই চলে যা তোর বৌ নিয়ে, আমার খুব লজ্জা লাগছে, মুকু। গমগম করে ওঠে মোরশেদ আলমের গলা। তোকে আমি ভালো মানুষ মনে করতাম। কিন্তু আজকে শুনলাম, তুইতো মানুষ না। অমানুষ।’
‘মামা!’
‘তোর মনে আছে কি না জানি না, তুই তখন পাঁচ বছরের। খুব ছুটাছুটি করিস, তোকে সামলে রাখা ছিল কঠিন। তোকে নিয়ে আপা জুরাইনে আমাদের বাড়িতে আসে, বেড়াতে। দুপুরের দিকে তুই খেলতেছিলি বাড়ির ভাড়াটে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে। ঘন্টা খানেক পরে খোঁজ করতে গিয়ে আর তোকে পাই না। আমরা- আব্বা মা চারদিকে ছড়িয়ে পড়লাম তোকে খুঁজতে। এদিকে তোর মা জুরাইনের কাঁচা রাস্তার ওপর গড়াগড়ি দিয়ে হাহাকার করে কাঁদছিল। শত শত মানুষ জমা হয়ে গেল— তোর মায়ের হাহাকার দেখে শত শত লোক খুঁজতে বের হয়ে গেল। অবশেষে তোকে পাওয়া গেল আমাদের বাড়ির চারবাড়ির পর একটা বাড়ির মধ্যে ধুলোবালি মেখে খেলতেছিস। তোকে সেই ধুলোবালি মাখা শরীরে আপা তোকে জড়িয়ে কতো চুমো খেয়েছিল… সে দৃশ্য আমার চোখে আরও ভাসে। কিন্তু আজকে যা শুনলাম- খুবই মারাত্মক। দুলাভাই ঠিকই করেছে। তোর বরং চলে যাওয়াই ভালো এই বাসা ছেড়ে, যা চলে যা। আপার সামনে, দুলাভাইয়ের সামনে ওই নোংরা মুখ নিয়ে আসিস না।’
পাথরের মতো জমে যায় আহমেদ মুকুল। আমরিন নাহার লতা হকবাক। এতো গভীরের গোপন অভিসার প্রকাশ হয়ে গেলো! মাথার ওপর কাক উড়ছে আর কা কা করছে। মেহবুবা খানম হুইল চেয়ার ঘুরিয়ে ভেতরে চলে গেলে, পিছনে পিছনে ঢোকে খায়রুল বাশার। মোরশেদ আলমও বের হয়ে যায় বিপন্ন মুখে। শিবরাম রায়ের মোবাইলে একটা ফোন আসে। ফোন রিসিভ করতে করতে বের যায় নিজের বাসার দিকে। খোলা জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে এক সময়ে বের হয়ে যায় মুকুল আর লতা।
এতোক্ষণ রুমের মধ্যে আটকে ছিল সিমন। মুকুলরা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রুম থেকে বের হয়ে নিজের মতো খেলতে শুরু করে খোলা করিডোরে সিমন, দাদু আসো ফুটবল খেলি! চিৎকার করে ডাকে বাশারকে। কয়েক দিন আগে বিকেলে সিমনকে নিয়ে বাইরে বেড়াতে গিয়ে বলটা কিনে দিয়েছিল বাশার। দুজনে মিলে বারান্দায় খেলে। খেলতে খেলতে দুটি গ্লাস ইতিমধ্যে ভেঙ্গেছে।
বাশার না আসায় নিজেই খেলে সিমন। ডান পায়ে ফুটবলটাকে মুকুলের রুমের দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকিয়ে চিৎকার করে, গো ও ল…
