আষাঢ়ের বিকেলগুলো এমনই। কখন যে রোদ নিঃশব্দে বৃষ্টি হয়ে নামে, কেউ বলতে পারে না। দুপুরে হাটে যাওয়ার সময় আকাশ ছিল ধোঁয়া-তোলা নীল, রোদের ভেতরে যেন গরমের কাঁপুনি লেগে ছিল। কিন্তু ফেরার পথে রফিক মিয়া দেখলেন, পশ্চিম দিগন্তে কালচে মেঘ জমেছে। দূরের তালগাছগুলো অকারণে অস্থির হয়ে উঠেছে, যেন আসন্ন বর্ষার গোপন সংবাদ তারা আগেই পেয়ে গেছে। বাতাসে ভেসে আসছে কাঁচা মাটির গন্ধ, আর নদীর দিক থেকে এক ধরনের স্যাঁতসেঁতে শীতলতা ধীরে ধীরে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
তিনি হাঁটার গতি একটু কমালেন। হাতে সেই পুরোনো ছাতা। একসময় কালো ছিল, এখন ধূসর। কাপড় জুড়ে অসংখ্য সেলাই। কোথাও লাল সুতা, কোথাও সাদা, কোথাও নীল। যেন কাপড় নয়, সময়ের ক্ষতগুলোর ওপর সময়েরই প্যাঁচ। তিনটি কাঁটা বাঁকা হয়ে গেছে; খুললে ছাতাটি আর গোল হয় না, একদিকে কাত হয়ে থাকে।
ছাতাটির বয়স ঠিক কত, তা রফিক মিয়ারও মনে নেই। মানুষের জীবনে এমন কিছু জিনিস থাকে, যাদের আগমনের দিন মনে থাকে না, অথচ তাদের অনুপস্থিতি কল্পনা করা যায় না। এই ছাতাটাও তেমন।
একসময় এটি ছিল নতুন, চকচকে, শক্তপোক্ত। বাজার থেকে কিনে আনার দিন হালিমা অনেকক্ষণ ধরে উল্টেপাল্টে দেখেছিল।
‘এইবার মনে হয় পাঁচ-দশ বছর নিশ্চিন্তে চলবে।’
পাঁচ-দশ বছর তো অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে। তবু ছাতাটি রয়ে গেছে।
হাটের মোড়ে রহমানের চায়ের দোকানের সামনে কয়েকজন বসেছিল। রফিক মিয়াকে দেখে একজন হেসে বলল, ‘চাচা, ওই ছাতাটারে জাদুঘরে দেন। এত পুরান জিনিস এখন আর পাওয়া যায় না।’
আরেকজন বলল, ‘নতুন একটা কিনে ফেলেন। বাজারে ভালো ভালো ছাতা এসেছে।’
রফিক মিয়া থামলেন না। শুধু মৃদু হাসলেন।
একসময় তিনিও এমন আড্ডায় বসে মানুষকে নিয়ে হাসাহাসি করতেন। তখন হাঁটায় জোর ছিল, কাঁধে শক্তি ছিল। মানুষ ভাবে, যৌবন কখনো শেষ হবে না। সময়ের সবচেয়ে বড় কৌশল হলো, সে কাউকে আগেভাগে কিছু বুঝতে দেয় না।
হঠাৎ বৃষ্টি নামল। প্রথমে বড় বড় ফোঁটা। তারপর ঘন, টানা। রফিক মিয়া ছাতাটা খুললেন। বাতাসে ছাতাটি কেঁপে উঠল। তার মনে হলো, বহুদিনের এক সঙ্গী হাঁপাতে হাঁপাতে এখনও পাশে থাকার চেষ্টা করছে।
কাঁচা রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে তিনি নদীর দিকে তাকালেন। এই নদীই তার জীবনের অনেক কিছু কেড়ে নিয়েছে।
তিন বিঘা জমি। একটা আমবাগান। একটা টিনের ঘর।
আমবাগানের কথা এখনও মাঝে মাঝে মনে পড়ে। জ্যৈষ্ঠের দুপুরে গাছের নিচে দাঁড়ালে বাতাসেও আমের গন্ধ থাকত। বড় ছেলে তখন ছোট। গাছের নিচে লাফিয়ে লাফিয়ে বলত, ‘ আব্বা, ওইটা পাড়ো!’
হালিমা দূর থেকে বকত। রফিক মিয়া হাসতেন।
তখন মনে হতো, জীবন এমনই থাকবে।
মানুষ যখন সুখে থাকে, তখন সে সবচেয়ে বড় ভুলটি করে। সে ভাবে, এই অবস্থাটাই স্থায়ী।
নদী সে ভুল ভেঙে দিয়েছিল। এক বর্ষায় এক কোণা গেল। পরের বর্ষায় আরও কিছু। তারপর একদিন দেখা গেল, যে জমির ওপর দাঁড়িয়ে তিনি সারা জীবন কাটিয়েছেন, সেটাই আর নেই।
তারপরও নদীকে তিনি ঘৃণা করতে পারেননি। কারণ নদী যা নেয়, সময়ও একদিন নীরবে তাই কেড়ে নেয়।
বৃষ্টি আরও ঘন হলো। চারপাশ ঝাপসা। রফিক মিয়ার মনে পড়ল হালিমার কথা। পঁয়ত্রিশ বছরের সংসার। এখন ভাবলে মনে হয়, জীবনটা যেন কয়েকটি বর্ষার বিকেল মাত্র।
হালিমা বেঁচে থাকতে এই ছাতাটা নিয়ে কত কথা বলত।
‘ছাতাটা নিয়ে যেও।’
‘ লাগবে না।’
‘ বৃষ্টি নামলে তখন বুঝবা।’
তারপর সত্যিই বৃষ্টি নামত। রফিক মিয়া ভিজে ফিরে এলে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকত হালিমা। হাতে গামছা, চোখে অকারণ রাগ।
‘এত ভিজলা কেন?’
রাগের ভেতরেও কত অদৃশ্য ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে, মানুষ তা সাধারণত বুঝতে পারে সে মানুষটি চলে যাওয়ার পর।
আজ সাত বছর হলো হালিমা নেই। মৃত্যুর পরে মানুষকে সবচেয়ে বেশি কোথায় পাওয়া যায় জানেন? কোনো ছবিতে নয়। কোনো কবরেও নয়। পাওয়া যায় অভ্যাসের মধ্যে।
রফিক মিয়া এখনও ভাত খেতে বসে কখনো কখনো দুইজনের জন্য পানি ঢেলে ফেলেন। তারপর মনে পড়ে আরেকজন তো নেই। তিনি চুপচাপ গ্লাসটা সরিয়ে রাখেন।
সন্ধ্যার পর উঠোনে বসে কখনো অজান্তেই বলে ফেলেন,
‘ হালিমা, লণ্ঠনটা জ্বালাও তো।’
কথাটা মুখ থেকে বেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই তিনি থেমে যান। চারপাশে শুধু নীরবতা। যেন অন্ধকারও তার ভুল ধরিয়ে দেয়।
বৃষ্টির শব্দ আরও ঘন হয়ে আসে। রাস্তায় কেউ নেই। দূরের মাঠগুলো কুয়াশার মতো ঝাপসা।
হাঁটতে হাঁটতে রফিক মিয়ার হঠাৎ মনে হলো, জীবনের সবচেয়ে বড় একাকীত্ব আসলে একা থাকা নয়। সবচেয়ে বড় একাকীত্ব হলো এমন একজনকে মনে পড়া, যার সঙ্গে স্মৃতি ভাগ করা যায়, কিন্তু বর্তমানের নীরবতা আর ভাগ করা যায় না।
বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। টিনের চালের ওপর বৃষ্টির অবিরাম শব্দ। বারান্দায় একটি পুরোনো চেয়ার, পাশে লণ্ঠন, আর চারদিকে এক ধরনের গভীর নিঃশব্দতা।
একসময় এই বাড়িতে নীরবতা বলে কিছু ছিল না। রান্নাঘর থেকে হাঁড়ির শব্দ ভেসে আসত, উঠোনে মুরগি ডাকত, ছেলেরা মারামারি করত, পরীক্ষার আগের রাতে পড়া না পারলে কান্নাকাটি করত। হালিমা এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ঘুরে বেড়াত।
বাড়িটা এখনও একই আছে। শুধু শব্দগুলো আর নেই; তাদের অনুপস্থিতিই এখন সবচেয়ে বেশি শোনা যায়।
মাঝে মাঝে রফিক মিয়ার মনে হয়, দেয়ালগুলো এখনও সেই পুরোনো দিনগুলো মনে রেখেছে। কিছু কিছু রাতে ঘুম ভেঙে তার মনে হয়, পাশের ঘরে কেউ হাঁটছে। তারপর বুঝতে পারেন মানুষ নয়, স্মৃতিই হেঁটে বেড়াচ্ছে।
নীরবতাও বয়সের সঙ্গে বদলে যায়। যৌবনে নীরবতা বিশ্রামের মতো লাগে। বার্ধক্যে নীরবতা কখনো কখনো শাস্তির মতো লাগে।
একদিন সন্ধ্যায় আলমারির ওপর ধুলোজমা একটি টিনের বাক্স নামাতে গিয়ে রফিক মিয়া কয়েকটি পুরোনো জিনিস পেলেন। ছেলেদের স্কুলের রিপোর্ট কার্ড, মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণপত্র, আর হালিমার হাতের লেখা একটি ছোট কাগজ। তাতে শুধু লেখা ছিল, ‘বাজার থেকে ফেরার সময় ছাতা নিতে ভুলবা না।’
কথাটা পড়ে তিনি অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইলেন। এত ছোট একটি বাক্যও যে মানুষের বুকের ভেতর এত গভীর শব্দ তুলতে পারে, তা তিনি আগে বুঝতেন না।
কাগজটা ভাঁজ করে আবার বাক্সে রেখে দিলেন। কিন্তু মনে হলো, কিছু জিনিস বাক্সে রাখা যায় না; তারা মানুষের ভেতরেই থেকে যায়।
সে রাতে বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে তার মনে হচ্ছিল, হালিমা যেন এখনও এই বাড়ির কোথাও আছে। হয়তো রান্নাঘরের অন্ধকারে, হয়তো বারান্দার বাতাসে, নয়তো সেই ভাঙা ছাতার সেলাইগুলোর মধ্যে, যেখানে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালোবাসা শুকিয়ে যায় না, শুধু আরও নীরব হয়ে ওঠে।
রফিক মিয়া ছাতাটা মেলে রাখলেন। সেখান থেকে টুপটুপ করে পানি পড়ছে।
টুপ।
টুপ।
টুপ।
তিনি চেয়ারে বসে ছাতার দিকে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ মনে হলো, এই ছাতাটা আসলে কোনো জিনিস নয়। এটা তার নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি। একসময় নতুন ছিল সবাই ভরসা করত। প্রয়োজন ছিল। এখন জীর্ণ। তবু পুরোপুরি বাতিল নয়।
একটা সময় ছিল, সংসারের সবাই তাকে ডাকত। বাজারে কী হবে, জমিতে কী বোনা হবে, মেয়ের বিয়ে কোথায় হবে? সব সিদ্ধান্ত তার। আজ কেউ কিছু জিজ্ঞেস করে না। ছেলেরা নিজেদের মতো সিদ্ধান্ত নেয়, নাতিরা মোবাইলে ব্যস্ত থাকে।
তবু কোনো বিপদ এলে সবার প্রথম ফোনটা তার কাছেই আসে। যেমন ভাঙা ছাতার কথা কেউ মনে রাখে না, যতক্ষণ না বৃষ্টি নামে।
ঠিক তখনই ছোট নাতি রায়হান বারান্দায় এসে দাঁড়াল। ‘দাদু, তুমি নতুন ছাতা কিনো না কেন?’
রফিক মিয়া একটু চুপ করে থাকলেন। তারপর ছাতার হাতলে বাঁধা পুরোনো লাল সুতাটার দিকে তাকালেন। বহু বছর আগে হালিমা বেঁধে দিয়েছিল, যাতে হাটে অন্য কারও সঙ্গে বদলে না যায়।
তিনি মৃদু হেসে বললেন,— সব পুরোনো জিনিস ফেলে দিলে মানুষ নিজের অতীত কোথায় রাখবে রে?’
রায়হান কিছু বুঝল না। আবার ভেতরে চলে গেল। কিন্তু রফিক মিয়া অনেকক্ষণ লাল সুতাটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
সেদিন রাতে বাতাস আরও জোরে উঠল। বারান্দায় রাখা ছাতাটা ধপ করে মাটিতে পড়ে গেল। একটি বাঁকা কাঁটা ভেঙে আলাদা হয়ে গেল। তিনি ধীরে ধীরে উঠে ছাতাটা হাতে নিলেন। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন। মনে হলো, এবার হয়তো সত্যিই ফেলে দেওয়া উচিত।
একটা ছাতা আর কতবার মেরামত করা যায়? তিনি বারান্দার কোণে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর অদ্ভুতভাবে নিজের কথাই মনে পড়ল,মানুষকেও তো একদিন সবাই পুরোনো ভাবে।
তাহলে কি পুরোনো হলেই ফেলে দিতে হয়? তিনি ছাতাটা নামিয়ে রাখলেন।
রাত গভীর হলো। লণ্ঠনের হলুদ আলোয় তিনি সুই-সুতা বের করলেন। কাঁপা হাতে ছেঁড়া অংশে আবার সেলাই বসাতে লাগলেন।
চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। হাত কাঁপে। তবু কাজ থামে না। সেলাই করতে করতে হঠাৎ তার মনে হলো, মানুষও কি সারাজীবন এটাই করে না? যেখানে জীবন ছিঁড়ে যায়, সেখানে একটু একটু করে সেলাই বসায়।
কখনো সন্তানের হাসি দিয়ে।
কখনো ভালোবাসা দিয়ে।
কখনো ধর্ম দিয়ে।
কখনো স্মৃতি দিয়ে।
কেউই সম্পূর্ণ অক্ষত থাকে না। সকলেই নিজের মতো করে সেলাই-দেওয়া, জোড়া-লাগানো মানুষ।
কাজ শেষ হলে তিনি ছাতাটা খুলে দেখলেন। সেলাইগুলো স্পষ্ট দেখা যায়। সুন্দর লাগছে না। তবু মজবুত হয়েছে। সেই মুহূর্তে তিনি এক অদ্ভুত শান্তি অনুভব করলেন। যেন হঠাৎ জীবনের একটা বড় সত্য বুঝতে পেরেছেন। সৌন্দর্য সবসময় নিখুঁততায় থাকে না। সৌন্দর্য কখনো কখনো নিঃশব্দ টিকে থাকার মধ্যেও থাকে।
পরদিন ভোরে ফজরের আজান ভেসে এল। আকাশ এখনও মেঘলা। দূরে আবার বৃষ্টির রেখা দেখা যাচ্ছে। রফিক মিয়া দরজার সামনে দাঁড়ালেন। হাতে সেই পুরোনো ছাতা। তিনি জানেন, একদিন ছাতাটা আর চলবে না। একদিন তার নিজের শরীরও আর চলবে না। সবকিছুরই শেষ আছে।
কিন্তু শেষের আগে পর্যন্ত টিকে থাকারও একটা মর্যাদা আছে। মানুষের জীবন হয়তো বড় কোনো বিজয়ের গল্প নয়। হয়তো তা শুধু হারানোর, ভাঙার, ক্ষয়ে যাওয়ার ইতিহাস। তবু সে ইতিহাসের মাঝখানে কিছু মানুষ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। ভাঙা ছাতার মতো।
ঝড় থামাতে পারে না। বৃষ্টি আটকাতে পারে না। তবু মাথার ওপর সামান্য একটা আশ্রয় ধরে রাখে। রফিক মিয়া ছাতাটা খুললেন। বাতাসে কাপড়টা কেঁপে উঠল। তার ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটল।
দূরের মসজিদ থেকে আবার আজানের ধ্বনি ভেসে এল। তিনি একবার আকাশের দিকে তাকালেন। মনে হলো, মেঘের ওপারেও হয়তো কেউ মানুষের এই নীরব টিকে থাকাকে দেখছে।
তারপর তিনি কাদামাখা পথ ধরে হাঁটতে শুরু করলেন।
সামনে বৃষ্টি।
পেছনে বৃষ্টি।
মাঝখানে একটি মানুষ। আর তার মাথার ওপর বহুবার সেলাই-দেওয়া, সময়ের ক্ষত বয়ে চলা, তবু এখনও হাল না-ছাড়া, বৃষ্টির বিরুদ্ধে নীরব টিকে থাকার এক ভাঙা ছাতা।
